মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিচারের আওতায় নিতে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) আবেদন জানাবে রোহিঙ্গাদের পক্ষের আইনজীবীরা। মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ না হলেও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিধনযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে তার আওতা বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের মতে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় নিধনযজ্ঞের দায়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক বিচার সম্ভব। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনার তদন্ত করতে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে বুধবার (৩০ মে) অপরাধ আদালতে ৪০০ রোহিঙ্গার পক্ষে আইনজীবীরা আবেদন জানাবেন।
গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ। গত নভেম্বরে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রোহিঙ্গা নিপীড়নকে নিধনযজ্ঞ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে দেশটি।
কোনও রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ সংঘটনকারী নাগরিকদের বিচারের ক্ষেত্রে অনিচ্ছা কিংবা অক্ষমতা প্রকাশ না করা পর্যন্ত অপরাধ আদালত সেই নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। মিয়ানমার সে দেশে সংঘটিত সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। সেই হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিচারের সুযোগ থাকার কথা। তবে মিয়ানমার আইসিসির সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, এ আদালতের বিচারব্যবস্থাকেও অনুমোদন করে না। সে কারণে আন্তর্জাতিক আদালতকে পরিস্থিতি নিয়ে অবহিত করার বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে মিয়ানমারের মিত্র দেশ চীন এবং রাশিয়া এরইমধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় রোহিঙ্গা বিতাড়নকে সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধ বিবেচনা করে মিয়ানমারের বিচার শুরু করা যায় কিনা; গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে (৯ এপ্রিল) সে ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে আইসিসি-তে আবেদন করেন এর কৌঁসুলি ফাতাও বেনসুউদা।
কয়েকদিনের মাথায় এক বিবৃতিতে মিয়ানমার সরকার অপরাধ আদালতের কৌঁসুলির পদক্ষেপকে ১৯৬৯ সালের জাতিসংঘের ভিয়েনা চুক্তি ও আইসিসি সনদের প্রস্তাবনার লঙ্ঘন আখ্যা দেয়। নেপিদোর পক্ষ থেকে ওই পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা আখ্যা দেওয়া হয়। একইদিনে পাল্টা বিবৃতিতে আইসিসির কৌঁসুলিদের দফতর থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনায় মিয়ানমারের বিচারের ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে আইসিসিতে করা কৌঁসুলি বেনসুউদার আবেদন, এ বিষয়ে তার পূর্ণ সতর্কতার বহিঃপ্রকাশ। ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে কৌঁসুলিদের প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তারা কোনও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান ও বিচারব্যবস্থার আওতার মধ্যে থেকেই তা করতে চান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ আইসিসি সনদ ও ভিয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। কৌঁসুলিদের দফতর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য অপরাধের একাংশ নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। তাই আইসিসির আওতায় মিয়ানমারের বিচার সম্ভব। আজ সেই জায়গা থেকেই রোহিঙ্গাদের আইনজীবীরা মিয়ানমারের বিচারের আবেদন জানাতে যাচ্ছেন।
স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের আইনজীবীরা বুধবার আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হবেন। সেখানে তারা যুক্তি দেখাবেন যে আইসিসির উচিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো ও তাদের বিচারের মুখোমুখি করা। রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে এ ধরনের অপরাধ চলতে থাকবে এবং অন্য জাতিগোষ্ঠীর ওপরও নিপীড়ন ছড়িয়ে পড়বে। স্কাই নিউজ জানিয়েছে, আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করবেন যে নিপীড়িত রোহিঙ্গারা যেহেতু বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশ আইসিসিভুক্ত দেশ, সেক্ষেত্রে মিয়ানমারকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব।
উল্লেখ্য, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কেবল একটি ঘটনায় সেনা সদস্যদের অভিযুক্ত করেছে। ইনদিন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যার ঘটনায় সাত সেনাকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আটক হওয়া দুই রয়টার্স সাংবাদিককে এখনও আটক করে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারের সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় তাদের ১৪ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।








