মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞের সময় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নিপীড়নের যে বর্ণনা দিয়েছে, তার পক্ষে ফরেনসিক প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নৃশংস ঘটনা তদন্তকারী মার্কিন সংগঠন ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (পিএইচআর) এর মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞরা এমন দাবি করেছেন। বাংলাদেশের পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভিত্তিতে করা প্রতিবেদনে পিএইচআর বলছে, রোহিঙ্গাদের যে গুলি করা হয়েছে, কোপানো হয়েছে এবং বিস্ফোরণে তারা আহত হয়েছে তার ফরেনসিক প্রমাণ আছে। পিএইচআর-এর প্রতিবেদনটি এখনও প্রকাশ না হলেও তা হাতে পাওয়ার দাবি করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে। মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়,মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুড়তে থাকে সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা।
ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (পিএইচআর) নামক মার্কিন সংগঠনটি বিশ্ব্যাপী সংঘটিত নৃশংসতার তদন্ত করে থাকে। এটি মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন। স্থলমাইনে আহতদের নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালে সংগঠনটিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।এবার তারা মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গার স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। সংস্থাটির দাবি, রোহিঙ্গারা যে সব নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছে, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার প্রমাণ মিলেছে।
মূলত মিয়ানমারের চুত পিন গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। চুত পিন গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ২৫ জন রোহিঙ্গার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে পিএইচআর। এর মধ্যে ২২ জনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ১৭ জনের গায়ে ছিল গুলির আঘাত, লাথি খেয়ে কিংবা পিটুনি খেয়ে ৫ জন ট্রমায় ভুগছিলেন। আর তিনজনের গায়ে ছিল বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার ক্ষত। এছাড়া কারও কারও শরীরের ছুরির আঘাত পাওয়া গেছে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন অন্তত দুইজন। পিএইচআর বলছে, ‘বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা যে ধরনের নিপীড়নের বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে সকল ফরেনসিক পরীক্ষা ও মেডিক্যাল রেকর্ডগুলো সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নৃশংসতার উল্লেখযোগ্য নমুনা হলো চুত পিন। মানবতাবিরোধী অপরাধ বিবেচনা করে এর বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মনে করছে পিএইচআর।
উল্লেখ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড,কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও মিয়ানমার শুরু থেকেই তাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কথিত বৈধ কাগজপত্রের অজুহাতসহ নানা কারণে প্রক্রিয়াটি এখনও বিলম্বিত করে যাচ্ছে মিয়ানমার। একজন রোহিঙ্গাও ওই চুক্তির আওতায় রাখাইনে ফিরেছে বলে জানা যায়নি।
এরইমধ্যে পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা আবাস বুলডোজারে গুড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। এক পর্যায়ে সেনা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও অব্যাহত রাখা হয়েছে জাতিগত নিধন। সামরিকায়নকে জোরালো করতে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে অবশিষ্ট ঘরবাড়িও। জমি অধিগ্রহণের ঘোষণার সমান্তরালে শুরু হয় অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন।








