মিয়ানমার সেনাবাহিনীর খুন, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগের ক্ষত নিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গাদের মিলেছে আশ্রয়। সেখানকার ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় ছোট ছোট খুপড়ি ঘরে বৃষ্টির মওসুম বাড়িয়েছে জীবনের কষ্ট। এত কষ্ট সত্ত্বেও জীবনকে স্বাভাবিক করায় প্রচেষ্টায় প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে রোহিঙ্গারা। গাছের বাকলের তৈরি ঐতিহ্যবাহী বিশেষ থানাকা লেই (পেস্ট) দিয়ে মুখ রাঙিয়ে রোহিঙ্গা নারীরা যেন আড়াল করতে চাইছেন জীবনের কষ্ট। মুখ রাঙিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়া রোহিঙ্গা নারীরা বলছেন, জীবনের গতিকে স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা হিসেবেই মুখ রাঙিয়ে রাখছেন তারা।
সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পেতে শত শত বছর ধরে গাছের বাকলের বিশেষ ধরণের এই পেস্ট ব্যবহার করে থাকেন রোহিঙ্গা নারীরা। গত বছর আগস্টে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর সেপ্টেম্বরে সেখান থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয় ১৩ বছরের রোহিঙ্গা কিশোরী জোহরা বেগম। রয়টার্সকে এই কিশোরী জানায়, ‘সাজগোজ করা আমার শখ, এটা আমাদের ঐতিহ্য।’ পাঁচদিন হেঁটে জামতলি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানো জোহরা বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের গুলি করেছে, গলা কেটেছে।’ নিজের গালে থানাকা পেস্ট মেখে তিনি বলেন, ‘শিবিরের একটি পাহাড়ের চূড়ার তাঁবুতে আমার বাস। আর সূর্যের প্রচন্ড তাপে প্রচন্ড গরম।’
রাখাইনে সেনা অভিযানের কারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে জোহরার মতো প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। রয়টার্সের চিত্র সাংবাদিক জোহরার মতো বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারীর থানাকায় রাঙানো মুখ বন্দি করেছেন। এসব নারীরা বলছেন, ত্বক মসৃণ আর ঠান্ডা রেখে সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে থানাকা ব্যবহার করেন তারা।
৯ বছরের রোহিঙ্গা শিশু জান্নাত আরা বলছে, ‘এই পেস্ট তাকে কুতুপালং শিবিরের কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।’ তার ভাষায়, ‘মুখ পরিষ্কার রাখতে আমি এই পেস্ট মাখি। আর মুখে কামড়ানো কিছু কীটপতঙ্গকে দূরে রাখে এই পেস্ট। তাই এটা আমাকে সুরক্ষা দেয়।’
মিয়ানমারের শুষ্ক অংশে পাওয়া যায় থানাকা বানাতে ব্যবহৃত গাছ। কাউক পাইন নামে পরিচিত এক ধরণের সমতল পাথরে গুড়া করা হয় ওই গাছের বাকল। আর তা থেকেই তৈরি হয় হলুদ রঙয়ের থানাকা পেস্ট।
বিভিন্ন আকৃতি দিয়ে মুখ লাগানো হয় এই পেস্ট। লাগানোর পর শুকিয়ে গেলে একটা পর্দা তৈরি হয়। এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মিয়ানমারে এটি প্রসাধনী হিসেবে নারীরা ব্যবহার করে থাকে। থানাকা গাছের বাকল থেকে পেস্ট তৈরিতে রোহিঙ্গা নারীরা এতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। এখন শরণার্থী শিবিরে বিক্রি হচ্ছে এই বাকল।
জোহরা বলেন, ‘ভাত না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারবো কিন্তু সাজগোজ ছাড়া নয়।’








