প্রথমবারের মতো আফ্রিকান বংশোদ্ভুত আইনপ্রণেতা পেতে যাচ্ছে পাকিস্তান। গত নির্বাচনে দক্ষিণ সিন্ধু প্রদেশের প্রাদেশিক পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আফ্রিকান বংশোদ্ভুত তানজিলা কামব্রানি। প্রাদেশিক পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ায় তার সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এই অঞ্চলে শত শত বছর ধরে বাস ক্ষুদ্র এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষই গরীব। তানজিলা নির্বাচিত হওয়ায় তারা তাদের পরিচয় সমুন্নত রাখার সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির হয়ে এবারের নির্বাচনে অংশ নেন আফ্রিকান বংশোদ্ভুত নারী তানজিলা কামব্রানি। ৩৯ বছর বয়সী এই নারী আফ্রিকার দেশ তানজিনিয়ার বংশোদ্ভুত। তার দাদার পিতা-মাতা তানজিনিয়া থেকে সিন্ধু অঞ্চলে এসেছেন। পাকিস্তানের মাকরান ও সিন্ধু অঞ্চলে বসবাসকারী নৃতাত্ত্বিকভাবে আফ্রিকান জনগোষ্ঠীটিকে স্থানীয়রা সিদি নামেই চেনে। তানজিলা আশা করেন, গত মাসের নির্বাচনে তার মনোনয়ন সিদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কলঙ্কা মোচনে সহায়তা করবে।
পর্তুগীজরা পূর্ব আফ্রিকা থেকে অনেক সিদিকে দাস হিসেবে ভারতে নিয়ে এসেছিল বলে মনে করা হয়। তবে ইতিহাসবিদরা বলছেন, তাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই সেনা সদস্য, ব্যবসায়ী, মুক্তা ডুবুরি ও মুসলিম তীর্থযাত্রী ছিলেন। মুঘল সম্রাটদের সময়ও তারা রাষ্ট্রের উচ্চপদে নিয়োজিত ছিলেন। তবে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে তারা বৈষ্যমের শিকার হন। তানজিলা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’কে বলেন, ‘স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা ছোট সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে আফ্রিকান মূল ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ধরে রাখতে আমরা সংগ্রাম করে যাচ্ছি। কিন্তু আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন সিদি নামটি ঘৃণা নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।’
পাকিস্তানে সিদি সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খুব ভালভাবে মিশে গেলেও কিছু আফ্রিকান ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের বার্ষিক উৎসব। ইসলামি আচার, কুমিরকে খাবার দেওয়া এবং সোয়াহিলি ও বেলুচ ভাষার মিশ্রনে গান গেয়ে এই উৎসব পালন করেন তারা। উৎসবটিতে সম্পূর্ণ আফ্রিকান আমেজ থাকে। পাকিস্তান ছাড়াও ভারতের কর্নাটক, গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশে সিদি সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে।
পাকিস্তানের করাচির লিয়ারি জেলায় সিদি সম্প্রদায়ের বেশি বসবাস। তারা পাকিস্তান পিপলস পার্টির কট্টর সমর্থক। বেনজির ভুট্টোর ছেলে ও দলটির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল জারদারি ভুট্টো এবারের নির্বাচনে তানজিলা কামব্রানিকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেন। এর আগে কোনও দলই এই সম্প্রদায়ের কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। তানজিলা কামব্রানি বলেন, ‘কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেছেন, ঠিক সেভাবেই বিলাওয়াল সিদিদের আবিস্কার করেছেন।’
সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে পিপিপি তৃতীয় স্থানে থাকলেও সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদে তারা আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে। তাই প্রাদেশিক পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নে তানজিলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের মা তানজিলা কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর। বাদিনের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা তানজিলার বাবা একজন আইনজীবী আর মা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। তার পরিবার এখনও আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে। তার এক বোনকে তানজানিয়ায় বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘানার নাগরিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যখন ঘানার নাগরিকের সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে হয় স্থানীয় তরুণ ও ঘানা থেকে আসা অতিথিদের একই রকম মনে হচ্ছিল। তারা মোগো ঢোলের তালে তালে ঐতিহ্যবাহী সিদি নাচ করেছিল। মোগো ঢোলকে ঘানার বাদ্যযন্ত্র বলা হয়ে থাকলেও আমরা ঐতিহ্যগতভাবেই নিজেদের বাড়িতে তা বাজিয়ে থাকি। আপনি সিদি নাচিয়েদের একজন আফ্রিকানের কাছ থেকে আলাদা করতে পারবেন না।’
সিন্ধুর বেশিরভাগ সিদির মতোই তানজিলা কামব্রানি দীর্ঘদিন ধরে পিপিপি’র সঙ্গে যুক্ত আছেন। এর আগেও জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে। তবে প্রাদেশিক পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ায় তাকে সম্পূর্ণ নতুন দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে নিজের সম্প্রদায়ের জন্য। তানজিলা বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে তার ভার অনুভব করছি’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন সিদি, আর সব মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যব্তিত ও শ্রমিক শ্রেণির সিদিরা জানে যে, আমি তাদেরই একজন। আর এর মানে হলো তারা আমার কাছে অনেক কিছুই প্রত্যাশা করবে।’ সূত্র: বিবিসি।








