ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণায় প্রণীত আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে সেখানে বসবাসরত হাজার হাজার আরব জনগণ। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ইহুদি জনগণের একাংশও ফিলিস্তিনি দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। শনিবার মধ্য-তেলআবিবে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
চলতি বছরের জুলাই মাসে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হওয়া ‘জাতিরাষ্ট্র বিষয়ক আইন’ অনুযায়ী দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদিদের জন্মভূমি আখ্যা দেওয়া হয়। বলা হয়, সঙ্গত কারণেই এখানকার মাটিকে নিজেদের দাবি করার অধিকার রয়েছে তাদের। আইনে অবিভক্ত জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিতর্কিত এই আইনে ইসরায়েলকে প্রথম ও একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বলা হয় ইসরায়েল শুধু ইহুদি নাগরিকদের রাষ্ট্র। এই আইন তৈরির কারণ হিসেবে বিবিসি বলেছে, কোনও কোনও ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ মনে করেন নিজেদের প্রাচীন মাতৃভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন নীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
দেশটিতে প্রায় ৮৮ লাখ আরব সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, যারা আরবি ভাষায় কথা বলেন। তাদের দ্রুজ বলা হয়। ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র বানানোর আইনটির বিরুদ্ধে সোচ্চার এই জনগোষ্ঠী। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার রাজধানী তেল-আবিবে হাজার হাজার আরব-বিক্ষোভকারী পথে নেমে আইনটির বিরোধিতা করে। তাদের হাতে ছিল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের পতাকা। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তারা অভিযোগ করে, এই আইনটি তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে রূপান্তরিত করবে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ওই কর্মসূচিতে ইসরায়েলের ইহুদিরাও অংশ নিয়ে আরব নাগরিকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলে ইসরায়েলকে অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্ণবাদী রাষ্ট্র আখ্যা দেওয়া হয়। হিব্রু আর আরবি ভাষায় লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড আর ব্যানারে দাবি তোলা হয়: ‘বর্ণবাদকে গ্রহণ করা যায় না’ কিংবা ‘সমতাই শেষ কথা’ জাতীয় বক্তব্য হাজির করা হয় সেইসব ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে।
উল্লেখ্য, ইহুদি ধর্মের নামে, ‘জায়নবাদ’ নামের মতবাদের মধ্য দিয়েই ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র। জায়নবাদ ইহুদি ধর্মের দর্শন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ; অলীক রূপকথায় যে মতবাদের শরীর গড়ে উঠেছে। জায়নবাদের ভাষ্য, জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পবিত্র নগরীতে স্রষ্টা তাদের অধিকার ফিরিয়ে নিতে বলেছিল! ইতিহাসে নজর ফেরালে দেখা যায়, ১৮ শতক থেকে জায়নবাদ নামের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা তাদের বর্ণবাদী ধারণার বিস্তার ঘটিয়ে দখল হওয়া ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম দেন। জায়নবাদের মাধ্যমে তখন থেকে আজ পর্যন্ত ইহুদি জনগণের মনে ফিলিস্তিনবিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। সেই বিদ্বেষী প্রচারণা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈরি করে তুললেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও রয়েছে সেখানে।
এরইমধ্যে পাস হওয়ার পর ওই আইনের নিন্দা জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মিসরও এই আইনপাসের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষসহ আরব নাগরিকেরা এই আইনকে বর্ণবাদী আইন আখ্যা দেয়। বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীরাও এই আইনের সমালোচনা করেছেন। এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটেও। বিরোধী দলীয় নেতা জিপি লিভিনি বলেছেন, তিনি এমন একটি আইন চান যেখানে ইসরায়েল ইহুদী রাষ্ট্র হলেও সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু আমাদের ইহুদী ও সংখ্যালঘুদের মাঝের সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর নতুন আইন করে এটা দূর করা হচ্ছে।’ লিভিনি দাবি করেন, আমরা আমাদরে জীবনের স্বাধীনতার সেই চেতনা ফিরিয়ে আনতে চায়। আপনাদের সময় শেষ। আমরা জয়ের আগমুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো।







