কারাবন্দি থাকা তিন বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া মুসলীম লীগ (পিএমএল-এন) নেতা নওয়াজ শরিফের স্ত্রী বেগম কুলসুম নওয়াজ মঙ্গলবার লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ২০১৭ সালের আগস্টে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর ৬৮ বছর বয়সী কুলসুম গত ১৪ জুন হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। পিএমএল-এন’র মুখপাত্র মরিয়ম আওরঙ্গজেব বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, তার শেষকৃত্য পাকিস্তানে সম্পন্ন হবে। তবে সেই অনুষ্ঠানে তার কারাবন্দি স্বামী ও মেয়ে যোগ দিতে পারবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়।
২০১৭ সালে স্বামী নওয়াজের পরিবর্তে লন্ডনে প্রবাসে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন কুলসুম নওয়াজ। তবে অসুস্থতার কারণে শপথ নিতে পারেননি তিনি। গত জুলাইতে তাকে অসুস্থ অবস্থায় লন্ডনে রেখে দুর্নীতির মামলার সাজা মোকাবিলা করতে পাকিস্তানে ফেরেন নওয়াজ শরিফ ও তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ। পাকিস্তানে অ্যাকাউন্টিবিলিটি আদালতে দণ্ড ঘোষণার পর বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন তারা।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিওনিউজের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকালের দিকে কুলসুম নওয়াজের শারিরীক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে লন্ডনের হারলি স্ট্রিট ক্লিনিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরে তিনি সেখানেই মারা যান। তার মৃত্যুতে অন্যান্যের মধ্যে শোক জানিয়েছেন পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। টুইটারে তিনি লেখেন, ‘বেগম কুলসুম নওয়াজের মৃত্যুর খবরে দুঃখ পেয়েছি। তিনি মহান মর্যাদার অধিকারী সাহসী নারী ছিলেন এবং নিজের রোগের সঙ্গে ধৈর্য্য নিয়ে মোকাবিলা করে গেছেন। শরিফ পরিবারের জন্য আমার সমবেদনা ও প্রার্থনা থাকবে।’
লাহোরে পিএমএল-এন নেতা খাজা ইমরান নাজির সাংবাদিকদের বলেছেন, বেগম কুলসুমকে তাদের পারিবারিক শহর রাইউইন্ডে সমাহিত করা হতে পারে। তবে পরিবারের সবার সঙ্গে আলোচনার পরই এই বিষয়ে পরিস্কার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা তাকে পাকিস্তানে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিলে মরদেহ দেশে আনতে দুই থেকে তিনদিন সময় লাগতে পারে।
কুলসুম নওয়াজ ১৯৭১ সালে নওয়াজ শরিফকে বিয়ে করেন। তার স্বামী ১৯৯০-৯২, ১৯৯৭-৯৯ এবং ২০১৩-২০১৭ মেয়াদে তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিহত হয়েছিলেন।
পাকিস্তানের লাহোরের সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারের ১৯৫০ সালে জন্ম কুলসুমের। মোহাম্মদ হাফিজ ভাট ও রাজিয়া বেগম দম্পত্তির এই সন্তানের পারিবারিক নাম ছিল কুলসুম রেহানা ভাট। এই দম্পত্তির আরও দুই মেয়ে ও দুই পুত্র ছিল। কাশ্মিরি বংশোদ্ভূত হলেও লাহোরে ভাট পরিবারের গভীর প্রভাব ছিল। রাজিয়া বেগম ছিলেন ভারতের অমৃতসরের প্রখ্যাত কুস্তিগীর গামা পালোয়ানের মেয়ে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর গামা পালোয়ান পরিবার নিয়ে লাহোর চলে যান।
পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও কৃতি ছিলেন কুলসুম নওয়াজ। ১৯৭০ সালে লাহোরের মর্যাদাবান ফোরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উর্দু সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। পরের বছরেই সম্পদশালী ও শিল্প মালিক পরিবারের সন্তান নওয়াজ শরিফকে বিয়ে করেন।
১৯৭০ এর দশকে পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয়করণ শুরু করে। এর আওতায় শরিফ পরিবারের মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ফলে ১৯৭৭ সালে ভুট্টো সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক অভ্যুত্থান হলে তাকে স্বাগত জানায় পরিবারটি। দুই বছর পর এক বিতর্কিত বিচারে ভুট্টোকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে ওই সামরিক সরকার।
সামরিক অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানালেও পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন কুলসুমের শ্বশুর মিয়া মোহাম্মদ শরিফ। ছেলে নওয়াজ শরিফকে রাজনীতির ময়দানে নামিয়ে দেন তিনি। ১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনী সমর্থিত পাকিস্তান মুসলীম লীগে যোগ দেন নওয়াজ শরিফ। যোগ দিয়েই পাঞ্জাবের তৎকালীন সামরিক গভর্নর জেনারেল গুলাম জিলানি খানের সুনজরে পড়েন নওয়াজ।
ব্যবসায়ে স্নাতক নওয়াজ কিছুদিনের মধ্যেই পাঞ্জাবের সামরিক বাহিনী পরিচালিত পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সালের দলবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যান নওয়াজ শরিফ। আর তার পাঁচ বছর পর ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৩ সালে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলে ১৯৯৭ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি।
এই দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল রাজনৈতিক প্রভাবের ধনী শিল্প পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে আড়ালেই থেকেছেন নওয়াজের স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ। তাদের সংসারে চার সন্তানের মধ্যে দুই পুত্র ও দুই কন্যা।
১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাবন্দি করা হলে প্রথমবার রাজনীতির মাঠে নামেন কুলসুম নওয়াজ। ওই সময়ে সামরিক বাহিনীর নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে তার পরিবারের সঙ্গে আটক করে গৃহবন্দি করে রাখে। এক বছর বন্দি থাকার পর সামরিক আদালতে নওয়াজ শরিফকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে পরবর্তী দশ বছর রাজনীতি না করার মুচলেকার বিনিময়ে পরিবারসহ সৌদি আরবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওই সময়ে পিএমএল-এন পার্টির অন্তবর্তী প্রেসিডেন্ট হন কুলসুম নওয়াজ। গৃহবন্দি রাখা পাহারাদারদের এড়িয়ে মডেল টাউনের বাড়ি থেকে বের হয়ে লাহোর শহর জুড়ে এক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন তিনি। ২০০২ সাল পর্যন্ত দলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কুলসুম।
পরে গত বছরের আগ পর্যন্ত আর রাজনীতিতে আর পা রাখেননি কুলসুম। গত বছর উচ্চ আদালতে তার স্বামী প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষিত হলে দল তাকে নওয়াজের আসনে উপ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়। তখন এই সিদ্ধান্তে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। তারা আশা করছিলেন নওয়াজের পরিবর্তে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদের মেয়ে মরিয়মকেই প্রার্থী করা হবে। কোনও কোনও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন কুলসুম কোনও রাজনীতি অনভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন না।
১৯৭০এর দশকের শেষ দিক থেকে স্বামী নওয়াজ শরিফের পুরো রাজনৈতিক জীবনে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন কুলসুম। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বামীকে পরামর্শ দিয়ে গেছেন তিনি। দলের কোনও কোনও নেতার মতে প্রায়ই স্বামী নওয়াজের ভাষণ লিখে দিতেন কুলসুম। ১৯৯৯ সালে মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানে স্বামীকে আটক করা হলে তার মুক্তির দাবিতে চালানো প্রচারণায় অগ্রণী ছিলেন কুলসুম।
তবে নিজের জন্য রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না কুলসুমের। গত বছর দলের মনোনয়ন পাবার পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলেন কুলসুম। কিন্তু তারপরই তিনি আবার লন্ডন ফিরে যান। প্রতিদ্বন্দ্বিরা তার প্রার্থীতা নিয়ে আপত্তি তুললে আবারো কমিশনে হাজির হন তিনি। পরে আবার লন্ডনে ফিরে যাওয়ার পর তার লিম্পফোমা ধরা পড়ে।
নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থীতা চূড়ান্ত করলে সেই উপ নির্বাচনে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন কুলসুম। তবে অসুস্থ থাকায় পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নিতে কখনওই দেশে ফেরা হয়নি তার।








