সন্ত্রাসবাদ ও মাওবাদী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া পাঁচ ভারতীয় অ্যাকটিভিস্টের গৃহবন্দিত্বের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হয়েছে। শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তাদেরকে আরও চার সপ্তাহ গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। সেইসঙ্গে পুলিশ কর্তৃক ‘শহুরে নকশাল’ আখ্যা পাওয়া ওই পাঁচ অ্যাকটিভিস্টের গ্রেফতারের ঘটনায় এসআইটি বা বিশেষ তদন্তকারী দলকে দিয়ে তদন্তের দাবিও খারিজ করে দিয়েছে আদালত। তিন বিচারপতির বেঞ্চের মধ্যে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ও বিচারপতি এএম খানউইলকর এসআইটি দিয়ে তদন্তের দাবি খারিজ করে দেন। আর এক বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় গ্রেফতারির বিরুদ্ধে রায় দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।
নকশালবাড়ী ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার একটি প্রত্যন্ত থানা। ষাটের দশকের শেষ দিকে সেখান থেকে মাওবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তবে নকশালপন্থী আন্দোলন সত্তরের দশকের প্রথমার্ধ্ব থেকেই গতি হারাতে শুরু করেছিল। নকশালবাড়ির ঘটনার পর রাজ্যের ছাত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছাত্র ফেডারেশনের ছাতা ছেড়ে কৃষকবিদ্রোহের সমর্থনে নেমে পড়েছিল। সেই সময় গড়ে ওঠা পাল্টা ছাত্র ফেডারেশনের ৯০ শতাংশই ছিল নগর ও শহরাঞ্চলের বাসিন্দা, যাদের পরিচিতি ছিল আরবান নকশাল। এবার গ্রেফতার হওয়া ওই পাঁচ ভারতীয় অ্যাকটিভিস্টের বিরুদ্ধে মাওবাদী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাদের ‘আরবান নকশাল’ আখ্যা দিয়েছে ভারতের পুলিশ।
২৯ আগস্ট থেকে নিজ নিজ বাসভবনে বন্দি রয়েছেন অ্যাকটিভিস্ট ভারভারা রাও, অরুণ ফেরেইরা, ভার্নন গঞ্জালভেস, সুধা ভরদ্বাজ ও গৌতম নাভলাখা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার পরিকল্পনা ও গত বছর ৩১ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁও গ্রামে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের তৎক্ষণাৎ মুক্তি চেয়ে শীর্ষ আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। কিন্তু আদালত বলেছে, এই সমাজকর্মীদের ভিন্ন মতের কারণে তাদের গ্রেফতার করা হয়নি, তাদের সঙ্গে নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের যোগাযোগের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শুক্রবার এ ৫ অ্যাকটিভিস্টের গৃহবন্দি থাকার মেয়াদ আরও ৪ সপ্তাহ বাড়িয়েছে শীর্ষ আদালত। এই সময়ের মধ্যে নিজেদের পছন্দমত আইনি সাহায্য নিতে পারবেন তারা। ৩ জনের মধ্যে ২ বিচারপতি বলেছেন, অভিযুক্তরা ঠিক করতে পারেন না, কোন তদন্তকারী সংস্থা ঘটনার তদন্ত করবে। রাজনৈতিক মত পার্থক্যের জন্য তাদের যে গ্রেফতার করা হয়েছে তাও নয়। পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ও বিচারপতি এএম খানবিলকর এক মত পোষণ করলেও ভিন্ন মত প্রকাশ করেন বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়। তিনি বলেন, এই ৫ সমাজকর্মীর গ্রেফতার ভিন্নমত দমনের চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। তার মতে, ভিন্ন মত উজ্জ্বল গণতন্ত্রেরই পরিচয়বাহী।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে এ পাঁচ অ্যাকটিভিস্টকে গ্রেফতার করেছিল পুনে পুলিশ। এরপরেই বাম বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতারির প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার, অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক, দেবকী জৈন, সমাজতত্ত্ববিদ সতীশ দেশপাণ্ডে, লেখক মায়া দারুওয়ালার মতো বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা। ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজদের গ্রেপ্তারে স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু তাতে সম্মত হয়নি শীর্ষ আদালত। পাঁচ বাম বুদ্ধিজীবীকে নিজেদের ঘরেই নজরবন্দি রাখার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বেঞ্চ জানায়, ধৃত বাম বুদ্ধিজীবীদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া যাবে না। তাদের বাড়িতেই নজরদারিতে রাখা যেতে পারে। গৃহবন্দি থাকার সময়ে তাঁদের সঙ্গে বাইরের কেউ দেখা করতে পারবেন না। বা তারাও বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না।








