ভূমিকম্প ও সুনামিবিধ্বস্ত ইন্দোনেশিয়ায় জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় দুই লাখ মানুষের এখন মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করতে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ত্রাণ আসছে ঠিকই, তবে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর মতো অবস্থা সেখানে নেই। রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ার কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানোই যাচ্ছে না। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্প ও সুনামিতে ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত’ এলাকার একটি বড় অংশেই পৌঁছাতে পারেননি ত্রাণকর্মীরা।
শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ার সুলাবেসি প্রদেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বড় হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। ভূমিকম্প ও সুনামিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পালু ও ডংগালা এলাকা। সেখানকার মানুষ মানবিক সহায়তার জন্য আকুতি করছে।
জাতিসংঘের ঘোষিত বরাদ্দের আওতায় অস্ট্রেলিয়া ৩৯ লাখ সহায়তা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় ৫০ জন চিকিৎসকও পাঠাবে। দুর্গত এলাকায় জরুরি ত্রাণ তৎপরতার জন্য ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ডলার) সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। তারা জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয়শিবির নির্মাণের সামগ্রী, সৌর বাতি ও পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র পাঠানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ত্রাণবাহী বিমানটি বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) ডনকাস্টার শেফিল্ড বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করার কথা। ব্রিটেনের জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি বৃহস্পতিবার অনুদান প্রদানের আবেদন জানিয়েছেন। নিউ জিল্যান্ড ৩২ লাখ ডলার সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জরুরি সহায়তাবাহী সামরিক বিমানে করে সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
দায়িত্বরত একজন সেনা কর্মকর্তা ইডা ডেউয়া আগাঙ্গ বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে ত্রাণ আসছে সুলায়সি দ্বীপে, যেমন স্থানীয় সরকারের কাছে থেকে তেমনি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার কাছ থেকে।’ রেডক্রসের পক্ষ থেকে বহনযোগ্য রান্নাঘর, তাঁবু, শরীরে ঝুলানোর মতো ব্যাগ আর মশারি বোঝাই তিনটি জাহাজ আসছে বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন-অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডের মতো দেশগুলো কোটি কোটি ডলারের ত্রাণের অঙ্গীকার করলেও দুর্গত এলাকায় তা কী করে পৌঁছানো যাবে, তা নিয়েই এখন ভাবতে হচ্ছে ইন্দোনেশিয়াকে। রাস্তাগুলো সব ভেঙে যাওয়ায় ত্রাণ পরিবহনের উপায় নেই। পালুর বিমানবন্দরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হারিয়েছে তার সক্ষমতা।
পালু এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চললেও ডংগালা খুব একটা মনযোগ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ত্রাণকর্মী ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সরকার সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। সেখানকার সবাই খাদ্য ও পানির জন্য মরিয়া হয়ে আছে। সেখানে খাবার, পানি ও জ্বালানি নেই।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডংগালার ৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বণ্টন ব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। পালুর বাসিন্দা অ্যান্ডি রুসডিং জানিয়েছেন, তারা কিছু পরিমাণ ত্রাণ সংগ্রহে সমর্থ হয়েছেন, তবে বণ্টন ব্যবস্থা ছিল খুবই বাজে। অ্যান্ডি রুসডিং অনেক পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে গাঁদাগাঁদি করে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘দয়া করে সরকার ও এনজিওগুলোকে জিজ্ঞেস করুন তারা সত্যিকার অর্থেই আমাদেরকে খাবার দিয়ে সহায়তা করতে চায় কিনা। শুধু নির্দেশ দিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। ভালো হয়, তারা যদি সরাসরি প্রত্যেক তাঁবুতে গিয়ে ত্রাণ বিতরণের কাজ তদারকি করেন। কারণ মাঝে মাঝে ত্রাণগুলো সমভাবে বিতরণ করা হচ্ছে না।’
ত্রাণের জন্য কয়েকদিন ধরে অপেক্ষার পর সহায়তা না পেয়ে হাঁটতে শুরু করেন পালুর লোলু সিগি বিরোমারু গ্রামের বাসিন্দা ওয়াসলিহা। ১০ ঘণ্টা ধরে হেঁটে নানা পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে সন্তানদের পানি খাওয়াতে পেরেছেন তিনি। বিবিসিকে ওয়াসলিহা বলেন, ‘আমাদের কাছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার ছিল না। পরনের কাপড়টুকুই শুধু আছে আমাদের।’ বিবিসির প্রতিবেদক জানান, ওয়াসলিহার সন্তানরা এতোটাই পিপাসার্ত ছিল যে পানি দেওয়ার পর এক নিঃশ্বাসে তারা তা খেয়ে ফেললো।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো দ্বিতীয়বারের মতো দুর্গত এলাকা সফর করেছেন। তবে দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ভূমিকার সমালোচনা করছেন। ইয়াহদি নামে পালুর দক্ষিণের এলাকার এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট দুর্গম এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি শুধু সুনামি আর পালুর কথা শুনছেন।’








