ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্প ও সুনামিতে ১ হাজার ৪শ ২৪ জন মানুষের মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য পেয়েছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ। এদের বেশিরভাগকেই এরইমধ্যে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে। এদিকে স্কাই নিউজ তাদের নিজস্ব সূত্রে অন্তত ১ হাজার মানুষের নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা জানিয়েছে। এখনও যেসব দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছানো যায়নি, সেই সব স্থানে পৌঁছাতে পারলে আরও অনেক মরদেহের সন্ধান মিলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে শত শত মানুষের চাপা পড়ে থাকার কথা জানিয়েছে দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে আর মাটির আড়ালে থেমে যাচ্ছে জীবন্ত মানুষের আর্তনাদ। নীরবে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। পচা-গলা মরদেহ থেকে প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ার সুলাবেসি প্রদেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বড় হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। উদ্ধার কার্যক্রম চলমান। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনও পৌঁছাতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্প ও সুনামিতে ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত’ এলাকার একটি বড় অংশেই পৌঁছাতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। ভূমিধসের কারণে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
ভূমিকম্পের প্রভাবে মাটি নরম হয়ে কাদায় রূপান্তরিত হয়। পায়ের নিচের শক্ত মাটিও তরলের মত আচরণ করে আর ঘর-বাড়ি দেবে যায়। একে লিকুইফ্যাকশন নামে ডাকা হয়। ৭.৫ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রভাবে দুর্গত অঞ্চলগুলোর ঘরবাড়ি দেবে গিয়ে চাপা পড়েছে ওই মাটির নিচে। স্কাই নিউজ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পালু শহরের উপকণ্ঠে দাঁড়ানো তিনটি এলাকার প্রায় ১ হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেতোবো, বালারোয়া ও সিগি এলাকায় যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের সংখ্যা গুণে স্কাই নিউজকে সম্ভাব্য এই পরিসংখ্যান দিয়েছে সেদেশের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র সুতোপো পুয়ো নুগরোহো জানান, পেতোবোতে বিধ্বস্ত ঘর-বাড়ি মাটির তিন মিটার নিচে চাপা পড়েছে। সেইসঙ্গে ওইসব বাড়িতে থাকা মানুষেরা মাটির নিচে চাপা পড়েছেন।
পেতোবো, বালারোয়া ও সিগির বাইরে অন্যান্য এলাকা থেকে আরও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুতোপো পুয়ো নুগরোহো বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া প্রচণ্ড ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। তবে এবারের ভূমিকম্পের পর লিকুইফ্যাকশনজনিত (মাটির তরলীকরণ) ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নজিরবিহীন।’
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো দ্বিতীয়বারের মতো দুর্গত এলাকা সফর করেছেন। তবে দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। ইয়াহদি নামে পালুর দক্ষিণের এলাকার এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট দুর্গম এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি শুধু সুনামি আর পালুর কথা শুনছেন।’ ইয়াহদি আরও বলেন, ‘আমার গ্রামে মাটির নিচে শত শত মানুষ এখনও চাপা পড়ে আছেন। আমি আমার পরিবারের অনেক সদস্য ও প্রতিবেশীদের হারিয়েছি।’
এবিসি নিউজ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে। তবে ভূমিধস, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া, সেতু ভেঙে পড়ার কারণে উদ্ধারকারীরা দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে পারছেন না। জাতিসংঘ আশঙ্কা জানিয়েছে, এখনও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি বড় অংশে পৌঁছানো যায়নি। তবে উদ্ধারকারীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক মুখপাত্র জেন লায়ের্কে মঙ্গলবার (২ অক্টোবর) বলেন, ‘উদ্ধারকারী দলগুলো চেষ্টা করছে, তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালাচ্ছে।’ উদ্ধার তৎপরতায় ধীর গতি নিয়ে হতাশা জানিয়েছে রেড ক্রসও। তবে উদ্ধারকারীরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছে তারা।
ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক আসিয়ান কো-অর্ডিনেটিং সেন্টার ফর হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিসটেন্স, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহ দ্রুত সৎকারের ওপর জোর দিয়েছে। মৃতদেহ রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে অনেক ব্যাগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে তারা। আসিয়ান কোঅর্ডিনেটিং সেন্টার ফর হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিসটেন্স কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, পচা-গলা এসব মৃতদেহ থেকে প্রাণঘাতী রোগের জন্ম হতে পারে।
ব্রিটিশ রেড ক্রসের জরুরি ব্যবস্থাবিষয়ক প্রধান বেন ওয়েবস্টের দুর্গত এলাকায় উদ্ধার প্রচেষ্টায় নিযুক্তদের পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর ও খুব আবেগপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। ওয়েবস্টের বলেন, ‘এক একটি দিন পার হচ্ছে আর জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমি স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে গল্প শুনেছি যে লাশের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে হলেও তারা জীবিতদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।’








