শক্তিশালী ভূমিকম্প ও প্রলঙ্কারী সুনামি আঘাতের পর ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরের বেঁচে যাওয়া মানুষ এখন নতুন সংকটে পড়েছেন। খাদ্য ও পানির অভাব সাময়িকভাবে ত্রাণের মাধ্যমে পূরণ হলেও আগামীতে কীভাবে দিন-যাপন করবেন তা নিয়ে আশঙ্কার মধ্যে আছেন তারা। সুলবেসি দ্বীপে জোড়া দুর্যোগে গৃহহীন হয়ে পড়া ৭০ হাজারের বেশি মানুষ এখন নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন।
ভূমিকম্প-সুনামির এক সপ্তাহ পর ইন্দোনেশিয়া সরকার ব্যাপক আকারে পরিচ্ছন্নতা ও পুনর্বাসন কাজে মনযোগী হয়েছে। এই দুর্যোগে দেশটিতে আনুমানিক ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে ও কমপক্ষে ১৫৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামগুলো পুনর্নিমাণ ও মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা বলেছেন, অঞ্চলটিতে বারবার ভূমিকম্পের মোকাবিলায় নতুন করে নির্মিত অবকাঠামো আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।
৭০ হাজারের বেশি গৃহহীন ও প্রিয়জন হারানো মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা এখন কী করবে। ভূমিকম্প ও সুনামিতে যাদের বাড়ি-ঘর ধ্বংস হয়নি তারাও সেখানে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বড় ধরনের আফটার শক হলে সেগুলো ভেঙে পড়তে পারে। অনেকে এটাও জানেন যে, আগামী বেশ কয়েক সপ্তাহ বা আরও বেশি সময় তাদের ত্রাণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে।
এমন অনিশ্চয়তার মুখে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে কাঙ্ক্ষিত স্থানে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে ভীড় করছেন। এছাড়া অনেক মানুষ মোটরসাইকেল বহরে করে দক্ষিণ দিকের বড় শহরগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এখনও পালুর বেশিরভাগ মানুষই খোলা আকাশের নিচের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। তারা অনেকটা ভীত হয়ে পড়েছেন। কয়েকদিনে পালু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করলেও এখনও ত্রাণ বন্টন কেন্দ্রগুলোতে প্রচণ্ড গোলযোগ দেখা দিচ্ছে। কারণ সেখানকার মানুষ এখনও তীব্র ক্ষুধা ও পিপাসায় কষ্ট পাচ্ছে।
পালুর বিসুসু জেলার স্থানীয় থানায় স্থাপন করা একটি ত্রাণ বন্টন কেন্দ্রে শত শত মানুষ পানি ও রান্না করা নুডুলসের জন্য ভীড় করছে। অনেক মানুষ এজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ত্রাণের খোঁজে অনেক দূর থেকে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাদের নিজেদের এলাকায় কোনও সাহায্য না পৌঁছানোয় খাবারের খোঁজে তারা এতদূর এসেছেন। তাদেরই একজন ইসমানিয়া সামপোলে বলেন, ’যদি আমরা খাবার না খুঁজি তাহলে আমরা খেতে পাবো না।’ তিনি বলেন, ‘মেয়রের অফিস পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত এই শহরের বাইরের মানুষ কোনও সহায়তা পাচ্ছে না।’
ইন্দোনেশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কাল্লা এই উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের তদারকি করছেন। তিনি কাদায় পরিণত হওয়া পেতোবো এলাকার পাশের বালারোয়া আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। পেতোবো গ্রামের অনেক বাসিন্দাই সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, এখানকার বাসিন্দাদের অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। কারণ তাদের গ্রাম পুনর্নিমাণ করা অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, সরকার জরুরি তৎপরতার জন্য দুই মান সময় নিয়েছে। এর মধ্যে ঘর হারানো মানুষদের জন্য অস্থায়ী নিবাস তৈরি করা হবে। জুসুফ কাল্লা বলেন, ‘তারপর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ও ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ শুরু করবো।’
ওই বালারোয়া এলাকারই একজন বাসিন্দা ছিলেন ভেরোনিকা। হাজার হাজার বাসিন্দার মতো ভেরোনিকাও তার পরিবার-পরিজন নিয়ে একটি নোংরা ফুটবল মাঠের পাশে জড়ো হয়েছেন। সুনামিতে নিজের গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর তিনি পরিবার নিয়ে পালু শহরে যাওয়া জন্য ব্যাপক চেষ্টা করছেন। পালু শহরে গেলেও সেখানে নিজের পরিবারের ভবিষ্যত অজানা। তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটনপোস্টের প্রতিবেদকের কাছে তিনি জানতে চান , ‘আমরা এখন কই যাবো?’
ভেরোনিকা পরিবার নিয়ে পুরো জীবন বালারোয়ার পেতোবো গ্রামে বাস করেছেন। কিন্তু সুনামির পর গ্রামটির মাটি কাদায় পরিণত হয়েছে। সেখানকার মাটি খুবই নরম হয়ে গেছে। তাই সেখানে বাস করা আর সম্ভব নয়। তার স্বামী নোভরিয়ান্তো বলেন, ভেরোনিকা গ্রামের অবস্থা দেখার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিজেদের বসবাসের জায়গার পাশাপাশি নিজের দুই শিশু সন্তানকে নিয়েও চিন্তিত ভেরোনিকা। শিশু দুইটি সুনামির পর থেকে আতঙ্কের মধ্যে আছে। তাদের একজন খুবই কম কথা বলছে। আরেকজন ঘুমের মধ্যে কান্নাকাটি করা ছাড়াও নানান কথা বলছে। বড় ছেলের সম্পর্কে ভেরোনিকা বলেন, ‘তাকে নিজের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করা হলে বলে, ওটা পুকুর হয়ে গেছে। অথবা সে কোন ক্লাসে পড়ে জানতে চাইলে বলে, স্কুল গলে গেছে।’








