রাখাইনে জাতিগত নিধনযজ্ঞের কবলে পড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ‘মগজ ধোলাই’ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন মিয়ানমারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী থুরা অং কো। তার দাবি, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসিত হতে দিচ্ছে না। কারণ, তাদের 'মগজ ধোলাই' করে মিয়ানমারের দিকে বাঙালি জনস্রোত ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে মিয়ানমার। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।
গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার একপর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না করতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়ে আসছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ২,২৬০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কথা থাকলেও পরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা স্থগিত করা হয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনকে নিরাপদ মনে করছিল না।
মঙ্গলবার মিয়ানমারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী থুরা অং কো দাবি করেন, বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করছে না। সংবাদ ওয়েবসাইট নিউজ ওয়াচ-এ শেয়ার করা ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘তারা (বাংলাদেশ) যদি তাদের (রোহিঙ্গা) ছেড়ে দেয় তবে ওই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাবে। এজন্য তারা ক্যাম্পে তাদের খাওয়াচ্ছে এবং বাঙালি তরুণদের মগজ ধোলাই করছে, যেন তারা অগ্রসর হয়। তারা মিয়ানমারের দিকে জনস্রোত নিয়ে এগিয়ে যায়। তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দলেবলে মিয়ানমারের দিকে ঠেলে দেওয়া।’
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। তাদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে দাবি করে থাকে। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতারকাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রসিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রংবেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।
মিয়ানমারের ধর্মমন্ত্রী থুরা অং কো দেশটির সাবেক জেনারেল। গত সপ্তাহেও একটি বিতর্কিত মন্তব্য করে মুসলিমদের ক্ষোভের মুখে রয়েছেন তিনি। গত ২৭ নভেম্বর এক বৌদ্ধভিক্ষুর শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, একটি ‘কট্টরপন্থী ধর্ম’ অবলম্বনকারীদের জন্ম হার বেড়ে চলেছে, যা মিয়ানমারের বৌদ্ধদের জন্য হুমকি। তিনি বলেন, ‘বৌদ্ধরা এক বিবাহ রীতির চর্চা করে এবং তাদের দুই বা তিন সন্তান থাকে। তবে একটি কট্টরপন্থী ধর্মে তিন বা চারটি বিয়েকে উৎসাহিত করা হয়, যেখানে ১৫ থেকে ২০ জন সন্তান জন্ম নেয়। বৌদ্ধ অধ্যুষিত এ দেশে তিন, চার কিংবা পাঁচ দশক পর বৌদ্ধ সম্প্রদায় নিশ্চিতভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।’
মঙ্গলবার থুরা স্বীকার করেছেন, তিনি ‘অন্য ধর্ম’ বলতে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়েছেন।








