যুক্তরাষ্ট্র-তালেবার শান্তি আলোচনা শুরুর প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের যুদ্ধের কর্তৃত্ব দাবি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাঘ ঘানি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান হাজির করে এই দাবি করেছেন তিনি। শুক্রবার তিনি বলেছেন ২০১৪ সালে তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৫ হাজারেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক জোটের সেনা সদস্যদের নিহতের সংখ্যা মাত্র ৭২। ‘এটাই দেখিয়ে দেয় যুদ্ধ আসলে কারা করছে,’ বলেন আশরাফ ঘানি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিহতের পরিসংখ্যান ব্যবহার করে যুদ্ধের কর্তৃত্ব দাবি করা গেলেও আফগান সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করে দিতে পারে এই পরিসংখ্যান।
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোটের হামলায় ক্ষমতাচ্যুত হয় আফগানিস্তানের তৎকালীন তালেবান সরকার। এরপর থেকেই দেশটিতে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক জোটের সেনা ও আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সশস্ত্র ওই গোষ্ঠীটি। দীর্ঘ ১৭ বছরের যুদ্ধ অবসানে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায় তালেবান। কাবুলের সরকারকে পুতুল সরকার আখ্যা দিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয় তারা। বৃহস্পতিবার তালেবানদের তরফে জানানো হয় কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চারদিন মুখোমুখি বসে কথা বলেছে তারা। শুক্রবারও ওই আলোচনা চলেছে কিনা তা স্পষ্ট না হলেও আগেই জানানো হয়েছে একটি চুক্তিতে পৌঁছানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আলোচকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা শুরুর খবরের পর শুক্রবার আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট মাঠের লড়াইয়ের কর্তৃত্ব দাবি করলেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আশরাফ ঘানি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে...৪৫ হাজারেরও বেশি আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করেছে’। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্থিতিশীল আফগানিস্তান পাওয়া দরকার যাতে আমেরিকান, ইউরোপীয়ান ও অন্য যারা আছে তাদের এবং আরও মৌলিকভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়’।
গত বছর আশরাফ ঘানি জানিয়েছিলেন ২০১৫ সাল থেকে তখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিহতের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার। সে কারণে শুক্রবার তার প্রকাশ করা মৃত্যুর পরিসংখ্যানকে আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। আফগান প্রেসিডেন্ট শুধুমাত্র নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেও দেশটিতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও নজিরবিহীর পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশটিতে দশ হাজারেরও বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিহতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা আশরাফ ঘানির জন্য বেশ খানিকটা অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে জানিয়েছে বিবিসি। সামরিক ঘাঁটি, সেনা ও পুলিশ সদস্যদের ওপর নিয়মিত তালেবান হামলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বা আফগান কর্মকর্তারা হতাহতের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করছে না। এসব তথ্যকে স্পর্শকাতর বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক সম্পাদক আনবারাসন এথিরাজন এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, যেকোনও সেনাবাহিনীর জন্যই ঘানির প্রকাশ করা পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জন করে সেনা বা নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। ২০১৪ সালের শেষে আন্তর্জাতিক জোটের বেশিরভাগ সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর আফগান পুলিশ ও সেনা সদস্যদের মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
আনবারাসন এথিরাজন লিখেছেন, আফগান কর্মকর্তারা যুদ্ধের কর্তৃত্ব দাবি করতে নিহতের পরিসংখ্যান ব্যবহার করতে পারলেও বিশ্লেষকরা বলছেন আফগান সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করে দিতে পারে এই পরিসংখ্যান। সামরিক পর্যববেক্ষকরা বলছেন আফগান সেনা সদস্যদের পাতলা করে বিশাল এলাকায় মোতায়েন করে রাখায় দুর্গম এলাকার তল্লাশি চৌকি ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারছে তালেবানরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করায় তালেবানরা মনে করছে পরিস্থিতি তাদের পক্ষে রয়েছে। কাবুলের সরকারের সঙ্গে কোনও ধরণের সম্পৃক্ততাই রাখছে না তারা।








