আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের এই যুগে দশকের পর দশক ধরে আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে বেঁচে থাকা বিপন্ন জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। কাঁটাতার আর ভৌগলিক সীমানায় পৃথককৃত মিয়ানমারের রাখাইন তাদের আদি আবাস। তবে নিজভূমিতে নিপীড়ন-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হওয়া তাদের বাস্তবতা। জাতিগত নিধন থেকে পালিয়ে শরণার্থী জীবন বেছে নেওয়াতেই যেন স্বার্থকতা তাদের। সেনা-নিপীড়নের মুখে সেই সত্তরের দশক থেকে যারা মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যেতে শুরু করে, তাদের অনেকেই সেখানে কয়েক বছর থাকার পর পাড়ি জমায় যুক্তরাষ্ট্রে। এদের একটা বড় অংশের বসবাস শিকাগো অঙ্গরাজ্যে। অনেকে সেখানে গেছেন ওই দুই দশকের আগে-পরেও। সবমিলে শহরটিতে এখন আছে ১৬শ’রও বেশি রোহিঙ্গা। নাসির জাকারিয়া নামের এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রচেষ্টায় ২০১৬ সালে শিকাগোতে গড়ে ওঠে রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ওই কেন্দ্রের প্রেরণায় মৃত্যুভয়ে নিজভূম ছেড়ে পালানো মানুষগুলো উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। আশাবাদী হয়ে ওঠে নতুন জীবনের পথে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র,কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। নাগরিকত্ব অস্বীকার করে রোহিঙ্গাদের রাখাইন ছাড়া মিয়ানমারের অন্যত্র ভ্রমণের অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের বড় অংশটি বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও কারও কারও প্রচেষ্টা থাকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেওয়ার। মালয়েশিয়া থেকে কেউ কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো অঙ্গরাজ্যে রয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। তা সত্ত্বেও নতুন করে জীবন গড়ার প্রচেষ্টা থামেনি তাদের। এই প্রচেষ্টায় অনন্য ভূমিকা রাখছে ‘রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে নাসির জাকারিয়া ২০১৬ সালে একান্ত প্রচেষ্টায় এটি গড়ে তোলেন। ওই কেন্দ্রের প্রেরণায় মৃত্যুভয়ে নিজভূম ছেড়ে পালানো মানুষগুলো উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। আশাবাদী হয়ে ওঠে নতুন জীবনের পথে। ইংরেজি ও কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি ওই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ভাষান্তর সেবা ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পাদনেও সহায়তা দিয়ে আসছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। তরুণদের বিনোদনে ফুটবল খেলার আয়োজনও তাদের তৎপরতার অংশ।
স্বামী সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়ার পর মিয়ানমার ছাড়েন জুলাহ নামের রোহিঙ্গা নারী। একটি নৌকায় করে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। এরপর কোনও খাবার-পানি ছাড়াই পায়ে হেঁটে জঙ্গল পেরিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। বহু পথ পাড়ি দিয়ে ২০১৪ সালে শিকাগোতে পৌঁছাতে সমর্থ হন তিনি। রোহিঙ্গা সাংস্কুতিক কেন্দ্র’র প্রেরণায় ইংরেজি শিখছেন তিনি। দুই মেয়ে এখনও মিয়ানমারেই। প্রায়ই তারা মাকে জানায়, কতটা সহিংসতা আর হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ১৯৭৭ সালে পালিয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়া নাসিমা শিকাগোতে পৌঁছাতে সমর্থ হন ২০১২ সালে। সেখানে পরিবারের অন্যরা ছিল আগে থেকেই। ২০১৮ সালে আরেক রোহিঙ্গা বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একটি খাবারের দোকান খোলেন শিকাগোতে। নাসিমার দুই মেয়ে আইশা ও নাজনীন তাদের মায়ের রেস্টুরেন্ট টি লিফ গার্ডেনে কাজ করে। রোহিঙ্গা সংস্কৃতির খাবারের পাশাপাশি মালয়েশীয় ও বার্মিজ খাবার পরিবেশন করা হয় ওই দোকানে।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হওযার পর দেশ ছাড়েন মাইমুনা শুকর। শুরুতে নৌকায় করে থাইল্যান্ডে পৌঁছান। সেখান থেকে সপরিবারে মালয়েশিয়ায়। সেদেশে শুকর ও তার পরিবারের সদস্যদের শিক্ষার সুযোগ ছিল না। কাজ করতে হতো অবৈধ পথে। সঙ্গে ছিল গ্রেফতার-হয়রানির ভয়। ২০১৪ সালে শিকাগোতে আশ্রয় মেলে তার পরিবারের। ২৫ বছর বয়সী মাইমুনার কোলে এখন তার তিন বছর বয়সী মেয়ে নোরফারজানা। তাবে আগলে রেখে নতুন করে বাঁচার চেষ্টায় বিভোর এই বিপন্ন নারী।
গত বছরের ডিসেম্বরে রোহিঙ্গা সংকটকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ। তবে সে দেশের পররাষ্ট্র দফতর রোহিঙ্গা নিধনকে এখনও গণহত্যার স্কীকৃতি দেয়নি। এদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্মম অভিবাসননীতি কষ্টসাধ্য করে তুলেছে যে কারও প্রবেশ। ভাগ্যহারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশ আগের থেকে কঠিন হয়ে উঠেছে।








