মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কি আরাকান আর্মিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে?

বিদেশ ডেস্ক
২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৯আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩২

মিয়ানমারের সরকারি বিবৃতিতে আরাকান আর্মিকে নিশ্চিহ্ন করার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বাস্তবে সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যপূর্ণ নীতি আর অব্যাহত সেনানিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব তারা। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো করেই দারিদ্র্য আর বঞ্চনার শিকার রাখাইন বৌদ্ধদের পক্ষে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার  ডাক দিয়ে তারা এরইমধ্যে জয় করতে সমর্থ হয়েছে তাদের হৃদয়। সবশেষ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনেও তাই ইঙ্গিত মিলেছে, সেনাবাহিনী আর আরাকান আর্মির সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইতিবাচক কিছু অর্জিত হবে না। সেনাদমন রাখাইনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র পন্থায় ঠেলে দিতে পারে সতর্ক করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, দমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মিকে রুখতে সমর্থ হবে না মিয়ানমার।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কি আরাকান আর্মিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে?

গত ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশের ফাঁড়িতে হামলা চালায় আরাকান আর্মির সদস্যরা। হামলায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও অপর ৯জন আহত হয়। ৫ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং মিয়াওয়াডি ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বে সংঘটিত যেকোনও হামলার চেয়ে এই হামলার ব্যাপকতা ও হামলাকারীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিলো। এর প্রতিক্রিয়ায় আরাকান আর্মিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী চিহ্নিত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের পক্ষ থেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কাচিন বিদ্রোহীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া আরাকান আর্মিরা ২০১৭ সালের সংকটের জন্য দায়ী করা দুর্বল আরসার চেয়ে অনেক বড় হুমকি। জেন’স আইএইচএস মারকিতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিস বলছেন, আরাকান আর্মির সেনারা উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং তাদের কাছে অনেক আধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতাকে চলমান সংকটের ‘চরম মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি ২০১৫ সাল থেকে আরাকান আর্মি কিভাবে ছোট একটি গোষ্ঠী থেকে ধাপে ধাপে রাখাইনে রাজনৈতিক ও সামরিক বিস্তার ঘটিয়েছে। এখন সেটা অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে তারা। সামরিক প্লাটুন এমনকি কখনও কোম্পানির মতো শক্তিশালী হয়ে প্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় প্রায় সবগুলো শহরেই প্রভাব বিস্তার করে আছে গোষ্ঠীটি এবং এটা একদমই অভিনব ঘটনা।

গত বছরের ডিসেম্বরে সশস্ত্র সংঘাত চলমান রাজ্যগুলোর মধ্যে ৫টি এলাকায় অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে মিয়ানমার। কিন্তু এগুলোর মধ্যে রাখাইন রাজ্য ছিল না। আরসা হামলার পরিকল্পনা করছে বলে রাখাইনকে অস্ত্রবিরতির আওতায় রাখা হয়নি। অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশটির রাজনীতি বিশ্লেষক ড. ইয়ান মিও থেন বলেন, ‘আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যেকোনও সামরিক অভিযানই বিপর্যয় ডেকে আনবে। নতুন অস্ত্রবিরতির বিষয়টাই বরং পর্যালোচনা করা উচিত। তিনি বলেন, ‘তাতমাদাও প্রস্তাবিত অস্ত্রবিরতি পুরো দেশব্যাপী হওয়া উচিত। এর সময়সীমা মাত্র চারমাস থেকে বাড়ানো উচিত বলেও মনে করেন তিনি। ইয়াও মিও বলেন, সরকার, তাতমাদাও এবং আরাকান আর্মিসহ জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ও নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস বন্ধনের কাজ অবিলম্বে শুরু করা উচিত। ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি কখনো শান্তি ডেকে আনতে পারবে না। শক্তিশালী ও কার্যকরী সংলাপের মাধ্যমেই এই অস্ত্রবিরতি আনতে হবে।

মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিষয়ক স্বাধীন গবেষক কিম জলিফি বলেন, ‘তিন দশক ধরেই এমন চলছে। জাতিগত সশষ্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলায় তাদের বেশিরভাগকেই কৌশলে অস্ত্রবিরতির আওতায় রেখেছে সেনাবাহিনী। গোষ্ঠীগুলো এতই বিভক্ত ও বিভ্রান্ত যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দাবি আদায় করতেও সক্ষম নয় তারা। অন্যদিক সেনাবাহিনীর লড়তে হচ্ছে অল্পকিছু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। 

আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী সামরিক ব্যবস্থা নিলে রাখাইন রাজ্যে আবারও শুরু হবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, যা সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ২০১৯ সালের শুরুতেই যেই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার জোরালো প্রভাব থাকবে কি না তাও নিশ্চিত নয়।

জলিফি বলেন, যুগ যুগ ধরে সকল রাজনৈতিক বিরোধী ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অবমাননাকর পদক্ষেপ নিয়ে আসছে সেনাবাহিনী। এছাড়া শান, ক্যারন, তাং, মন ও রাখাইনের বেসামরিকদের ওপর কাঠামোবদ্ধ রক্তক্ষয়ী অভিযান চালিয়ে আসছে তারা। সেখানে অনেকদিন ধরেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়। আমার মনে হয়, এসব এলাকার বাইরের মানুষরা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকে এবং এই সম্পর্ক খুব বেশি জানেও না। 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস  গ্রুপও বলছে, রাখাইনে আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক হামলায় জাতীয় শান্তি প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দুটি প্রক্রিয়াই হুমকির মুখে পড়েছে। আরাকান আর্মির হামলার মধ্যে নতুন ধারার সশস্ত্র পন্থার উত্থান দেখছে তারা। তাদের ওপর সেনাবাহিনীর চলমান দমন অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র সংঘাতের বাস্তবতা সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।  ব্রাসেলভিত্তিক সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, আরসার হামলার বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত দমন অভিযান ‘তাদের প্রতি স্থানীয়দের অপ্রকাশিত সমর্থনকে জাগিয়ে তোলা এবং তাকে আরও প্রকাশ্যে আনার মধ্য দিয়ে রাখাইনের সশস্ত্র সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

/এমএইচ/বিএ/
সম্পর্কিত
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম