ভারতীয় বিমানবাহিনীর এলিট ইউনিট ‘স্কাট’ বা `সূর্যকিরণ অ্যারোবেটিক’ টিমের সদস্য তিনি। অর্থাৎ বাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ ও যুদ্ধসফল বৈমানিকদের একজন। নাম উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান, বয়স মধ্য তিরিশের কাছাকাছি। ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল, সঙ্গে পেল্লায় মোচ। তাকে কেন্দ্র করেই এখন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রভাবিত হচ্ছে।
পারিবারিকভাবেও তার শরীরে বইছে সৈনিকের রক্ত। তার বাবা সিমহাকুট্টি বর্তমান ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন এয়ার মার্শাল, একসময় কলকাতাতে ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি। স্বভাবতই বাবাকে দেখেই অভিনন্দনের সেনাবাহিনীতে আসা। ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির এই স্নাতক বিমানবাহিনীতে ‘কমিশনড’ হয়েছিলেন ২০০৪ সালে।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর এই তরুণ সেনানীই বুধবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে অনেকটা নিজেরই অজান্তে বদলে দিলেন ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মাত্রাটা। যে ‘মিগ-২১’ বিমানটি তিনি চালাচ্ছিলেন, সেটি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মাটিতে ভূপাতিত হওয়ার পর অভিনন্দন জীবিত অবস্থায় ধরা পড়েন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে।
এরপর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তার একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছে। কোনওটি উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার, কোনওটি অভিনন্দনের চোখ বাঁধা অবস্থায়– আবার তাকে জেরা করার একটি মিনিটখানেকের সংক্ষিপ্ত ভিডিও-ও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে অভিনন্দন অবশ্য নিজের পরিচয় বা র্যাঙ্ক ইত্যাদি জানাতে অস্বীকার করেন।
ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বয়ান অনুযায়ী তিনি প্রথমে ছিলেন ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’ (অভিযানে গিয়ে নিখোঁজ)। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার বিকালে জানিয়েছেন, ভারতের বিধ্বস্ত মিগ-২১ বিমানটির চালক তাদের হেফাজতে আছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে ভারত সেটা যাচাই করে দেখছে। পরে অবশ্য সন্ধ্যায় আর একটি বিবৃতি দিয়ে ভারত কার্যত মেনে নিয়েছে, অভিনন্দন পাকিস্তানের হাতেই রয়েছেন। যেভাবে তার ভিডিওগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে সেটাকে অতি কুৎসিত প্রদর্শন (ভালগার ডিসপ্লে) এবং জেনেভা কনভেনশন তথা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন বলেও দাবি করা হয়েছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করছেন, ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত কতটা চরম মাত্রা নেবে তা এখন অনেকটা নির্ভর করছে অভিনন্দনকে আদৌ মুক্তি দেওয়া হয় কিনা বা দিলেও কী শর্তে বা কখন দেওয়া হয়– তার ওপর।
ভারতের খ্যাতনামা স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞ মারুফ রাজার কথায়, ‘পাইলট অভিনন্দন পাকিস্তানের হাতে জীবিত ধরা পড়ার ফলে ইসলামাবাদ অবশ্যই একটা দরকষাকষির অস্ত্র পেয়ে গেছে। এমনকি ভারতেও যারা যুদ্ধ নয়, শান্তি চান– তাদের জন্য এটা শাপে বর হয়ে দেখা দিতে পারে। কারণ অভিনন্দনকে নিরাপদে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টায় ভারতকেও হয়তো কিছুটা সংযম এখন দেখাতেই হবে।’
অভিনন্দন বর্তমান জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দির মর্যাদা পাবেন কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ আছে ভারতে অনেক পর্যবেক্ষকের। সাবেক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি যেমন বলছিলেন, ‘পাকিস্তান হয়তো বলার চেষ্টা করবে, দুই দেশের মধ্যে তো কোনও যুদ্ধই চলছিল না, তাই কীসের যুদ্ধবন্দি? ফলে ভারত জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী অভিনন্দনের মুক্তি চাইলেও পাকিস্তান হয়তো সেটা মানতে চাইবে না!’
ইতোমধ্যে অভিনন্দনকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দাবিতে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় জনমত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এদিন দুপুরের পর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুলভাবে ট্রেন্ড করছে (হ্যাশট্যাগ) #ব্রিংব্যাকঅভিনন্দন (অভিনন্দনকে ফিরিয়ে আনা হোক)। ভারত-শাসিত কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ টুইট করেছেন, অভিনন্দনকে দেশে ফিরিয়ে না-আনা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেন তার সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখেন।
এদিকে চেন্নাইয়ের যে জলবায়ু বিহার এলাকায় সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের কলোনিতে অভিনন্দনের অবসরপ্রাপ্ত বাবা এখন বাস করেন, সেই সোসাইটির বাইরে ভিড় করেছে ভারতীয় মিডিয়ার ওবি ভ্যান। গণমাধ্যমকর্মীদের ঠেকাতে একটা সময় বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে ওই সোসাইটির প্রবেশপথ।
একাত্তরের যুদ্ধের পর গতকাল মঙ্গলবারই আটচল্লিশ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকেছিল কোনও ভারতীয় যুদ্ধবিমান।
আকাশপথে ফাইটার জেটের নিয়ন্ত্রণরেখা পেরোনোর মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের শুরু, তাতেই আবার একটা নাটকীয় মোড় এলো শত্রুপক্ষের হাতে এক বৈমানিকের ধরা পড়ার মধ্য দিয়ে!








