নিউ জিল্যান্ডের দুই মসজিদে হামলায় নিহত ৫০ জনের মধ্যে একজন হলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নাঈম রশিদ। ক্রাইস্টচার্চের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন তিনি। ঘটনার দিন (১৫ মার্চ) ছেলে তালহাকে নিয়ে আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সম্প্রচারিত ভিডিওতে তাকে অস্ত্রধারীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। আহত অবস্থায় নাঈমকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান তিনি। সঙ্গে মারা গেছে তার ছেলে তালহাও। স্ত্রী আমব্রিন রশিদ ও তিন ছেলেসহ ক্রাইস্টচার্চে থাকতেন নাঈম। দুই সদস্যকে হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকে কাতর থাকলেও নাঈম ও তালহার সাহসী ভূমিকা নিয়ে গর্বিত তারা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রয়াত স্বামী ও ছেলেকে ‘উত্তম আত্মা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন আমব্রিন।
ক্রাইস্টচার্চ হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী। নানা কারণে তারা নিউ জিল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সিরীয় শরণার্থী হামজা মুস্তফা ও তার বাবা খালিদের মতো কেউ কেউ সংঘাত থেকে বাঁচতে নিউ জিল্যান্ডে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ আবার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নাঈমের মতো স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদে পাড়ি দিয়েছিলেন সেদেশে। তবে ১৫ মার্চের ভয়াবহ হামলায় তাদেরকে পাড়ি জমাতে হয়েছে না ফেরার দেশে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেদিনের সে দুঃসহ স্মৃতির কথা স্মরণ করেন নাঈমের স্ত্রী আমব্রিন রশিদ। বলতে থাকেন, ‘দুপুর দুইটার দিকে (১৫ মার্চ) আমার বোন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, আমার ছেলে তালহা ও স্বামী নাঈম কোথায়? আমার মনে আছে, ওর কথা শুনে ভাবছিলাম কেন ও আমাকে এ কথা জিজ্ঞেস করছে? কারণ এ সময়ে তো তাদের জুমার নামাজেই থাকার কথা।’ আমব্রিনের জানা ছিল না, ২১ বছর বয়সী ছেলে তানহা ও ৫১ বছর বয়সী স্বামী নাঈম তখন এক বন্দুকধারীর নৃশংসতার কবলে পড়েছে। অন্যদের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখেছে তারা।
ক্রাইস্টচার্চে বড় বোন নাঈমার বাড়ির নিচতলায় বসে বসে আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেন আমব্রিন। সদ্য প্রয়াত স্বামী নাঈম কিভাবে এক দশক আগে লাহোর থেকে নিউ জিল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সে কথা স্মরণ করেন তিনি। বলেন, ‘ও পাকিস্তানে ব্যাংকার হিসেবে কাজ করতো। পেশা পরিবর্তন করে শিক্ষকতায় যেতে চেয়েছিল সে। সেকারণে পিএইচডি করতে নিউ জিল্যান্ডে আসা তার। পিএইচডি শুরু করলেও শেষ করা হয়নি।’ ছোট ছেলে ছয় বছর বয়সী আয়ানের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আসার পর আমাদের একটি ছেলে হলো।’
আমব্রিন জানান, নাঈম নিউ জিল্যান্ডের চোখ জুড়ানো নীল আকাশ আর সবুজ ঘাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। সেকারণে নিউ জিল্যান্ডে থেকে গিয়েছিল পরিবারটি।
পরিবারসমেত ক্রাইস্টচার্চে থাকতেন নাঈম রশিদ। কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। তিনি ছিলেন পরিবারের প্রতি যত্নবান ও অনুরাগী। নিজের সন্তানদের পড়ানোর কাজও করতেন।
আরেক ছেলে ছেলে আব্দুল্লাহ রশিদের বয়স ১৯ বছর। প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সে। বাবা নাঈম সম্পর্কে আল জাজিরাকে সে জানায়, ‘সব কিছুতে তিনি আমাকে সহযোগিতা করতেন। আমাকে ও অন্যদেরকে প্রাধান্য দিতেন।’
আব্দুল্লাহ আরও বলে, ‘তার সঙ্গে (নাঈম) কথা বলাটা খুব আনন্দের ছিল। আমার যদি কোনও কিছু নিয়ে উৎকণ্ঠা হতো, তিনি আমার মন ভালো করে দিতে পারতেন। তবে জীবনটাতো ক্ষণস্থায়ী, আপনারা জানেন।’
বড় ভাই তালহা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ জানায়, তারা দুইজন পার্কে গিয়ে ফুটবল খেলতো। জীবন নিয়ে তাকে নানা মূল্যবান উপদেশ দিতো তার ভাই। মাঝে মাঝে পাহাড়ে সাইকেল চালিয়ে বেড়াতো তারা।
‘আমার জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে ভাই আমার পাশে ছিল। সে ঝুঁকি নিতে ভালোবাসতো। আর আমি ছিলাম সবসময়ই ভীতু প্রকৃতির। তবে তার কারণে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে, বেশি কিছু অর্জন করতে চাইলে জীবনে ঝুঁকি নিতে হয়।’ আল জাজিরাকে বলে আব্দুল্লাহ।
পাহাড়ের উঁচু-নিচু বেয়ে সাইকেল চালানোর ব্যাপারে আব্দুল্লাহ জানায়, ‘আগে আমি তা করতাম না। তার (তালহা) কারণেই এর প্রতি ভালোবাসা জন্মায় আমার।’
খালা নাঈমা জানান, পাহাড়ে সাইকেল চালানোর সময় তালহার তুলে আনা ছবিগুলোর অভাববোধ করবেন তিনি। নাঈমা বলেন, ‘ও বিভিন্ন জায়গা কিংবা কোনও সুন্দর পাতা দেখলে তার ছবি তুলে আমার জন্য নিয়ে আসতো।’
১৫ মার্চে আল নুর মসজিদে হামলার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীর মোকাবিলার চেষ্টা করছিলেন নাঈম। তার ওই সাহসী কর্মকাণ্ডের জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। নাঈমকে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
আমব্রিন বলেন, ‘আমার স্বামী ও ছেলে সত্যিকার অর্থে আমাকে গর্বিত করেছে। কারণ অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছে তারা। তারা দুইজনই উত্তম আত্মা।’
ইমরান খানের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে আমব্রিন বলেন, ‘এ পুরস্কার আমি আমার সন্তানদেরকে দেখাতে পারব। বিশেষ করে আমার ছোট ছেলে যখন বড় হবে তখন তাকে দেখাতে পারব যে তার বাবা কতটা সাহসী ছিলেন।’
পরিবার জানায়, তালহাও অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছে। তার খালা নাঈমা বলেন, ‘তালহা গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্য এক বালকের গায়ের ওপর পড়েছিল। ওকে তালহা আস্তে করে বলেছিল নড়াচড়া না করতে। বন্দুকধারী চলে যাওয়ার পর ওই ছেলে তালহার শরীরের নিচ থেকে জীবিত বের হয়ে এসেছিল।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা পাকিস্তানি প্রবাসীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মৃত্যুর পর তাদেরকে দেশে নিয়ে কবর দেওয়া হচ্ছে। তবে নাঈমের পরিবার তার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাকে নিউ জিল্যান্ডেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছেলে তালহাকেও তার পাশেই দাফন করা হবে। আমব্রিন জানান, হামলায় নিহত অন্যদের পাশাপাশি ক্রাইস্টচার্চ মেমোরিয়াল পার্ক সিমেট্রিতে সমাহিত করা হবে তাদেরও।
‘যেখানে মারা যাবে সেখানেই সমাহিত হতে চেয়েছিল নাঈম। আমি তার সে ইচ্ছাই পূরণ করছি। আর এটা তার বাড়ি।’








