বিনা অপরাধে ২৩ বছরের কারাজীবন, নিজ ঘরেই অচেনা তিন কাশ্মিরি

বিদেশ ডেস্ক
৩০ জুলাই ২০১৯, ১৪:১০আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৮

২৩ বছর আগে যখন গ্রেফতার হন, তখন মোহাম্মদ আলি ভাটের বয়স ছিল ২৫ বছর। ১৯৯৬ সালে দিল্লি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এরপর কারাগারে কেটে যায় দুই দশকের বেশি সময়। এই সময়ের মধ্যে হারিয়েছেন বাবা-মাকে। এখন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে ফিরে এলেও সবকিছুই অচেনা তার। কাউকেই চিনতে পারছেন না। একই রকম ঘটনা ঘটেছে আরও দুই কাশ্মিরির ক্ষেত্রেও।  দুই দশকেরও বেশি সময় বিনা অপরাধে কারাগারে বন্দি থাকার পর আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।   

বিনা অপরাধে ২৩ বছরের কারাজীবন, নিজ ঘরেই অচেনা তিন কাশ্মিরি

১৯৯৬ সালে লাজপাট নগর মার্কেটে একটি বোমা হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন আরও ৩৯ জন। এছাড়া রাজস্থান ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন-আরএসটিসির একটি বাসে হামলার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪ জন। ওই দুই ঘটনাতেই আসামি করে ভাটকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে দিল্লি আনা হয় লাজপাট নগর বিস্ফোরণের ঘটনায়। এরপর সামলেতি বিস্ফোরণের ঘটনায় নেওয়া হয় জয়পুরে।

সর্বশেষ ২২ জুলাই রাজস্থান হাইকোর্টের রায়ে মুক্তি পান ভাট। তার সঙ্গে আরও মুক্তি পায় আব্দুল গনি, মির্জা নিসার হুসেন, লতিফ আহমেদ রাজা ও জাভেদ খান। তবে মুক্তির পর ভাট, হুসেন ও ওয়াজার জীবন একদম পাল্টে গেছে। পৃথিবীর স্বাভাবিক আলো থেকে যে তারা দূরে ছিলেন ২৩টি বছর।

আলি ভাট বলেন, নির্দোষ হলেও তার কাছে কোনও প্রমাণ ছিল না। তারপরও ২০ বছরের বেশি সময় তাকে কারাগারে থাকতে হলো। যখন মুক্তি পেয়েছেন, তখন বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। বাবা মারা গিয়েছেন ২০১৬ সালে। মা আরও আগে, ২০০২ সালে। মুক্তি পেয়েই তাদের কবরের কাছে চলে যান আলি ভাট।
এরপর বাড়ি ফেরেন আলি। সেখানে অনেক মানুষ তাকে দেখতে জড়ো হন। সবাই জিজ্ঞাসা করতে থাকেন তাকে চিনতে পেরেছেন কিনা। কিন্তু আগে দেখা হওয়া সত্ত্বেও অনেককে চিনতে পারেননি আলি। ওই ব্যক্তি বলেন, আমি তোমার সঙ্গে কয়েক বছর তিহারে ছিলাম। আমাকেও অপরাধী ভাবা হয়েছিল। পরে মুক্তি পেয়েছি।

ভাট বলেন, তিনি কারাগারে বসে একবারই একটি ঘুড়ির কাগজ ও ভাঙা পেন্সিল দিয়ে চিঠি পাঠাতে পেরেছিলেন। এরপর কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়নি তার। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা বন্দিদের চিঠি নিজেদের কাছেই রেখে দিতো। একসময় যোগাযোগ থেকে দূরে থাকা আলি ভাট বলেন, এখন তার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা তাকে মোবাইল ফোন দিতে চায়। একথা বলেই হেসে ওঠেন তিনি।

ভারতের ধীরগতির বিচারিক ব্যবস্থা নিয়ে আলি ভাট বলেন, যদি ঠিকমতো কার্যক্রম পরিচালনা হতো তাহলে হয়তো বছরখানেকের মধ্যেই মুক্তি পেতেন তিনি। কিন্তু কেউই এই মামলা শেষ করতে চাইছিলো না।

ভাটের বাড়ি থেকে লতিফ আহমেদ ওয়াজার বাড়ির দূরত্ব ১০ মিনিটের পথ। সেখানেও একই দৃশ্য। তাকে তার আত্মীয়স্বজনরা ঘিরে বসে আছেন। যখনই কেউ দেখা করতে আসেন, ওয়াজা আগে মা’র দিকে তাকান। তিনি যেন পরিচয় করিয়ে দেন। দিল্লি পুলিশের কাছে গ্রেফতার হওয়ার সময় ওয়াজার বয়স ছিল ১৯ বছর। ওয়াজা বলেন, ‘আমি ভাগ্যের কাছে হার মেনে নিয়েছিলাম। আমি কারাগারে রাজেশকে চিনতাম, রাকেশকে চিনতাম। মুনা বজরঙ্গীকে চিনতাম, তার বোন আমাকে রাখি বাঁধতো। কিন্তু আমি আমার আত্মীয়দেরই চিনি না।
সামলেতি ও লাজপাত নগরের বিস্ফোরণ ছাড়াও তাকে আহমেদাবাদ ও রাজস্থানের বোমা হামলায়ও অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। তিনি জানান, গ্রেফতারের পর গুজরাট পুলিশ তাকে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলো যে তিনি কোনও উত্তর দেননি। তিনি বলেন, আমি পুলিশকে বলেছিলাম এসবের কিছুই জানি না। তখন তারা রেগে যায়। তবে আমাকে আশা দিয়েছিলেন তারা প্রমাণ করবেন যে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।

ওয়াজা বলেন, তাকে যখন তিহার থেকে রাজস্থানে নেওয়া হয় তখন আগে ১২১ ও ১২২ ধারায় ফাঁসানো হয়। তিনি বলেন, এর একবছর পর তাকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওয়াজা জানান, তিনি ভালো ক্রিকেট খেলতেন এবং নেপাল ক্রিকেট দলে সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু তার শেষ পর্যন্ত তিহারে কারাবন্দিদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে হয়েছে।

২০০৫ সালে ওয়াজাকে কারাগারে দেখতে গিয়েছিলেন তার বাবা। কিন্তু সেই কষ্ট সহ্য করতে পারেননি। বাড়ি ফিরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর সেই অসুস্থতাতেই তার মৃত্যু হয়। ওয়াজা বলেন, আমি বাবার মৃত্যুর একমাস পরে এই সংবাদ শুনতে পাই।
ওয়াজা বলেন, কারাগারেও কাশ্মিরিরা বিদ্বেষের শিকার হন। পুলওয়ামায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পর ওয়াজাসহ ১৪ জন কাশ্মিরিকে অন্য বন্দিরা পেটাতে শুরু করেন।

ওয়াজার বাড়ি অনেক কাছেই মির্জা নিসারের বাড়ি। গ্রেফতারের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তিনি জানান, এই মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া তার কাছে স্বপ্নের মতো। তিনি বলেন, ‘আমি এখনও ওই কারাগার নিয়ে দুঃস্বপন্ দেখি। আমি নিজের বিছানায় ঘুমাতেই পারি না।’

আলি ভাট, ওয়াজা ও নিসার তিনজনই বলেন, আইনজীবী, বিচার কিংবা তদন্ত কর্মকর্তারাও জানতেন তারা নির্দোষ। কিন্তু তারপরও তারা এই মামলা টেনে গেছেন। ওয়াজা বলেন, আমার মনে আছে একজন সিনিয়র অফিসার বলেছিলেন এই মামলার সঙ্গে কাশ্মিরিদের কোনও সংযোগ নেই। এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণও নেই।

/এমএইচ/বিএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম