কাশ্মিরে ভারতের ভয়াবহ সামরিক উপস্থিতির মধ্যেই সোমবার রাজ্যটি ভেঙে দুই টুকরো করে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগেই সেখানে আধা সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত ৩৫ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে এমন উসকানির মধ্যেই সমাধান দেখছেন বিজেপি সমর্থক ভারতীয় অভিনেতা অনুপম খের।
উপত্যকাজুড়ে আধা সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত ৩৫ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের গৃহবন্দি করার পর টুইটারে দেওয়া পোস্টে অনুপম বলেন, ‘কাশ্মিরের সমাধান শুরু হয়েছে।’ দৃশ্যত এর মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে ভারতের ভয়াবহ ও ভীতিকর সামরিক উপস্থিতি ও ধরপাকড়কে স্বাগত জানালেন তিনি।
তিনি বলেন, উপত্যকার যাবতীয় সমস্যার সমাধান হবে যদি ৩৭০ ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা তুলে দেওয়া যায়।
অনুপম খের অবশ্য বরাবরই বিজেপি ঘরানার মানুষ। তার স্ত্রী কিরণ খের বিজেপি-র এমপি। অনুপমের ভাষায়, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ মোদিজিকে সমর্থন করে আসছেন। সেই সংখ্যা খুব একটা কম নয়। তারপরও কেন বিরোধীরা এভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যেক পদক্ষেপে বাধা দিচ্ছে!’
এদিকে কাশ্মিরের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ। রবিবার রাত থেকে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে গৃহবন্দি করে রেখেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও নিজ বাড়িতে নজরদারির মধ্যে রয়েছেন সেখানকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ ও পিপলস কনফারেন্স পার্টির চেয়ারম্যান সাজাদ লোন। সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্পর্শকাতর এলাকায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রবিবার মধ্যরাত থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে শ্রীনগর জেলায়।
রবিবার কাশ্মিরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্পর্শকাতর এলাকায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। নিয়ন্ত্রণ রেখায় পাকিস্তানের সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি ও সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বহু স্থানে বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানকার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ। কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ছাত্রাবাস খালি করে ফেলারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাশ্মির পুলিশের দাবি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এদিন রাজ্য সরকারের এক নির্দেশনায় বলা হয় যেকোনও ধরনের সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ থাকবে। রবিবার মধ্যরাত থেকে শ্রীনগর জেলায় ১৪৪ ধারা কার্যকর করা হয়েছে।
বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরকে দেখেন ‘একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণকৃত এলাকা’ হিসেবে। সেই ২০১৩ সালে ‘আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে (কাশ্মিরে) রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মিরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক।’
২০১৩ সালের পর আরও ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কাশ্মির সংকটের সমাধানে সেখানে সেনা-সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। দমনপীড়নের পথেই হেঁটেছে ভারতীয় বাহিনী। গত সপ্তাহে আধাসামরিক বাহিনীর ৩৫ হাজার সদস্য মোতায়েন, আর আজ ৩৭০ ধারা বাতিলের ঘোষণার পর নতুন করে সেখানে আরও ৮ হাজার সেনা পাঠানো হলো। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যাপক মাত্রায় সামরিকায়ন, নিরাপত্তা তল্লাশির সূত্রে হওয়া নির্বিচার হয়রানি ও স্বশাসনের অধিকার ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলো স্থানীয়দের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ জাগিয়ে তুলছে। তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে পাকিস্তান সমর্থিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর দিকে। তার মধ্যে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে স্বায়ত্তশাসনের আনুষ্ঠানিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হলো। সূত্র: নিউজ ১৮, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসি।








