অস্ট্রেলিয়ায় গত সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া দাবানলে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০ কোটি প্রাণী প্রাণ হারিয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুবিদরা আশঙ্কা করছেন, অব্যাহত দাবানলে স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ও সরীসৃপ জাতের অন্তত ৪৮ কোটি প্রাণী জীবন হারিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মেট্রো।
অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত গ্রীষ্মকালে তাপদাহের কারণে জঙ্গলে দাবানল হয়। স্থানীয়রা একে বলে থাকে বুশফায়ার। এই দাবানল কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, টেলিভিশনের পর্দায় মাঝেমধ্যেই উঠে আসে তার করুণ চিত্র। আগুনের এই রোষের মুখে অসহায় হয়ে পড়ে মানুষ। কখনও সংলগ্ন এলাকা থেকে মানুষজনকে উদ্ধার করা অথবা দাবানলের পথে গাছ কেটে আগুন থামানোর চেষ্টাতেই অবলম্বন খোঁজেন স্থানীয়রা। সরকারিভাবে বিমান থেকে বিশেষ তরল মিশ্রণ ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টাও করা হয়। তবে সে প্রচেষ্টা সব সময় সফল হয় না। তবে বুশফায়ার বা দাবানলপ্রবণ এলাকায় জনবসতি তুলনামূলক কম থাকে। ফলে লোকজনের প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কিছুটা কম হয়। তবে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া বিভিন্ন দাবানলে প্রচুর গাছ ও জীবজন্তুর প্রাণহানি ঘটেছে। বাস্ত্তবিদদের আশঙ্কা, কোটি কোটি পশু-পাখি ও প্রাণীর জীবনহানি হয়েছে।
সম্প্রতি দেশটির নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে এক ডজনেরও বেশি দাবানল ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বেশ কয়েকজন নিহত ও নিখোঁজ হয়েছে। এসব দাবানল থেকে রক্ষা পেতে আশ্রয়ের খোঁজে হাজার হাজার মানুষ সেখানকার সমুদ্র উপকূলের দিকে পালিয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের শহর মাল্লাকোটার দিকে এগিয়ে যাওয়া এক দাবানল ঝুঁকিতে ফেলেছে বহু বাড়িঘর। স্থানীয়রা বলছেন, লাল হয়ে ওঠার আকাশের নিচে সমুদ্রে নৌকায় বা উপকূলে তাঁবু বানিয়ে বসবাসের অভিজ্ঞতা ভয়ানক। এই দাবানলকে জরুরি মাত্রা বলে ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
ধারণকৃত চিত্র ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ক্যাঙ্গারুগুলো ওয়ালসের আগুন থেকে বাঁচার জন্য পালানোর চেষ্টা করছে। ক্যাঙ্গারু উদ্ধার অভিযানে সময় দমকল বাহিনীর কর্মীরা হাজার হাজার দগ্ধ কোয়ালার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসংখ্য কাকাতুয়া মরে পড়ে রয়েছে সেখানে।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় দাবানলের কারণে ধ্বংসের পরিমাণ নির্ণয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ব। আকাশ থেকে তোলা ছবিতে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখা গেছে। দাবানলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় প্রাণীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোয়ালা, কারণ এই প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে চলাচল করে এবং ইউক্লিপটাস গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। আর এই গাছ বেশিমাত্রায় দাহ্য। ধারণা করা হচ্ছে, গত চার মাসে দাবানলে অন্তত ৮ হাজার কোয়ালা মারা গেছে। যা ওই অঞ্চলের মোট কোয়ালার এক তৃতীয়াংশ।
প্রকৃতি সংরক্ষণ কাউন্সিলের বাস্তুবিদ মার্ক গ্রাহাম অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন, দাবানল অতিমাত্রায়-অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপকমাত্রায় বিভিন্ন পশু-পাখি-প্রাণী মারা গেছে, বিশেষত গাছপালা পুড়ছে। তিনি আরও বলেন, ‘এতো বিশাল এলাকায় আগুনে পুড়েছে, এখনও জ্বলছে যার কারণে আমরা সম্ভবত সেখানের প্রাণীর মরদেহগুলো আর খুঁজে পাবো না।’
প্রাণী উদ্ধারকর্মী ট্র্যাসি বার্জেস বলেছেন, চিকিৎসার জন্য যে পরিমাণ পশু-প্রাণী আনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, আমাদের চিকিৎসাকেন্দ্র ততো বেশি প্রাণী আসেনি। কারণ সেখানে বেশিরভাগই মারা গেছে। তিনি এই বিষয়টিকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলে বর্ণনা করেছেন। বার্জেস ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমাদের উদ্বেগ হচ্ছে সেগুলো (পশু-প্রাণী) আমাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে আসছে না। মূলত কারণ সেগুলো আর জীবিত নেই।’
খোলা চিঠিতে ১৩টি সংগঠনের স্ট্যান্ড আপ ফর ন্যাশার নামের একটি জোট সতর্ক করে বলেছে, এই দাবানলের প্রভাব হচ্ছে মারাত্মক ও চলমান। এই প্রাণহানির পরিমাণ সম্ভবত কখনওই জানা যাবে না। তবে এটা নিশ্চিতভাবে কোটি কোটি হবে।
অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশমন্ত্রী সুশান লে বলেছেন, দাবানল বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া মৃত পশু-পাখি-প্রাণীর প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে না।
ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের শহর মাল্লাকোটা থেকে ৪ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানকার টেলিফোন লাইন ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে। দাবানল কবলিত এলাকার পানি সিদ্ধ হওয়ায় তা পান অনুপযোপী হয়ে পড়েছে।
আগুন থেকে বাঁচতে উপকূলে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য খাবার ও পানি সরবরাহের জন্য নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ভিক্টোরিয়া রাজ্য প্রশাসন। এছাড়া দাবানল কবলিত দুটি অঙ্গরাজ্য থেকে মোট সাতজন নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে চার জন ভিক্টোরিয়া থেকে ও অপর তিনজন নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে। ভিক্টোরিয়া রাজ্য প্রশাসন বলছে, নিখোঁজদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সত্যিকার শঙ্কা রয়েছে। তারা আগুন সক্রিয় এলাকায় ছিল। এখন তাদের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
আবহাওয়া কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, শনিবার শক্তিশালী বাতাস এবং তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার পর পরিস্থিতি আবারও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








