সাইবেরিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা আলেক্সাই নাভালনি কোমায় চলে গেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টোর সমালোচক এই নেতা বুধবার সকালে চা পানের পর একটি ফ্লাইটে করে মস্কো ফেরার সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার মুখপাত্র কিরা ইয়ারমাশ জানিয়েছেন, তাকে চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অচেতন থাকা নাভানলির শারীরিক অবস্থা নিয়েও ডাক্তাররা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। নাভানলির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলা হলেও এটাও জানানো হচ্ছে যে এখনও তার জীবন হুমকির মুখে রয়েছে আর তাকে রক্ষার চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাশিয়ার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে ৪৪ বছর বয়সী আলেক্সাই নাভালনি সুপরিচিত। পুতিনের বিরুদ্ধেও তিনি সবসময় সোচ্চার। অতীতে শারীরিক হামলার শিকারও হয়েছেন। বুধবার সকালে বিমানে সাইবেরিয়া থেকে মস্কো ফিরছিলেন তিনি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় জরুরি ভিত্তিতে বিমান অবতরণ করানো হয়। সেখান থেকে ওমস্ক শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে।
ওমস্ক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কৃত্রিম ফুসফুস ভেন্টিলেটরের সহায়তায় আলেক্সাই নাভালনি টিকে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র কিরা ইয়ারমাশ। এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘আমরা ধারণা করছি নাভানলির চায়ে কিছু একটা মিশিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ, ওই সকালে তিনি শুধু চা পান করেছিলেন। বর্তমানে অচেতন রয়েছেন তিনি।’
ক্রেমলিনবিরোধীদের ওপর বিষ প্রয়োগ কিংবা সন্দেহভাজন বিষ প্রয়োগের পর অসুস্থ হয়ে পড়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০০৬ সালে আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকোকে লন্ডনে চায়ের সঙ্গে পলোনিয়াম-২১০ মিশিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া সাবেক ডাবল এজেন্ট সের্গেই স্ক্রাইপালকে ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের স্যালসব্যুরিতে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করা হয়।
এসব ঘটনাসহ অন্য বিষ প্রয়োগের ঘটনাগুলোতে নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ সবসময়ই প্রত্যাখ্যান করে আসছে ক্রেমলিন। এগুলোকে রুশবিরোধী উসকানি আখ্যা দিয়ে আসছে তারা।
নাভানলিকে বিষ প্রয়োগের জন্য কাকে সন্দেহ করা হচ্ছে সে বিষয়ে কিছুই বলেননি তার মুখপাত্র কিরা ইয়ারমাশ। তবে হাসপাতালে পুলিশ ডেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আঞ্চলিক মুখপাত্র টাটিয়ানা শাকিরোভা নিশ্চিত করেছেন, ওমস্কের হাসপাতালে রয়েছেন নাভানলি। ডাক্তাররাও তার অবস্থা গুরুতর বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তার অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সম্ভাব্য সবকিছুই করছেন ডাক্তাররা। বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের মধ্যে বিষ প্রয়োগকেও একটি কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট করে কোনও কারণের কথা এখনই বলা সম্ভব নয়।’
আগামী মাসে রাশিয়ার আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আর ওই নির্বাচনে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নাভানলি ও তার মিত্ররা।
নাভানলি যে বিমানে মস্কো ফিরছিলেন সেই একই বিমানের যাত্রী ছিলেন পাভেল লেবেদেভ। নিজের অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন তিনি। এতে তিনি লিখেছেন, ‘ফ্লাইট শুরু হওয়ার পরই তিনি টয়লেট যান। এরপর আর ফিরে আসতে পারেননি। সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন তিনি। তাকে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছিল আর তিনি ব্যথায় চিৎকার করছিলেন।’
পরে নাভানলির বিমানটি ওমস্কে জরুরি অবতরণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, অসাড় নাভানলিকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছেন চিকিৎসা কর্মীরা।
নাভানলি ভ্রমণ করছিলেন এস৭ বিমান সংস্থার একটি বিমানে। এস৭ কর্তৃপক্ষ বলছে, বিমানের উড়াল শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন নাভানলি। আর ক্যাপ্টেন কাছাকাছি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন। বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, বিমানে তিনি কোনও কিছুই খাননি কিংবা পান করেননি।
নাভানলির মুখপাত্র ইয়ারমাশ জানিয়েছেন, বিমানে ওঠার আগে টোমস্ক বিমানবন্দরে এক কাপ চা পান করেছিলেন নাভানলি। গত বছর একই ধরনের আরেকটি ঘটনার সঙ্গে বুধবারের ঘটনার মিল দেখান ইয়ারমাশ। ওই ঘটনায় নাভানলি মারাত্মক অ্যালার্জি জনিত প্রতিক্রিয়ায় ভোগেন। এক ডাক্তার তখন বলেছিলেন, কোনও রাসায়নিকের বিষক্রিয়া থেকে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। ইয়ারমাশ বলেন, নিশ্চিতভাবে সেই একই ঘটনা এবারও তার সঙ্গে ঘটেছে।
লিথুনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিনাস লিনকেভিসাস বলেছেন, নাভানলির ওপর সম্ভাব্য বিষপ্রয়োগের ঘটনায় তিনি উদ্বিগ্ন। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘নিশ্চিত হতে পারলে দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই পরিণাম ভোগ করতে হবে।’








