ভারতের সঙ্গে তার নিকটতম প্রতিবেশীদের নানা ইস্যুতেই দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্যা তো দীর্ঘদিনের, চীনের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সমস্যা চলছে। আবার ভারতের সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বলে যে দেশটিকে মনে করা হতো, সেই নেপালের সঙ্গেও গত কয়েক বছর ধরে সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিচ্ছে। অথচ ভারত আর নেপাল দুই দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তারপরও কেন দুটি দেশের মধ্যে নানা ইস্যুতে মতান্তর হচ্ছে তা জানতে বিবিসি-র হিন্দি বিভাগের রজনীশ কুমার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গ্যায়ালির একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন:
মে মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ধারচুলা থেকে চীন সীমান্তে লিপুলেখ পর্যন্ত একটি রাস্তা উদ্বোধন করেন। নেপালের দাবি ছিল, ওই রাস্তা তাদের এলাকার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার আগে, ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মির থেকে লাদাখকে যখন আলাদা করা হলো, তারপর দিল্লি যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, তাতে লিপুলেখ আর কালাপানি, এই দুটি অঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত বলেই দেখানো হয়েছিল।
এ বছর নেপাল একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে। এতে কালাপানি আর লিপুলেখকে তাদের দেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। তারপরই দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে সীমানা নিয়ে বিবাদ আবারও সামনে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গ্যায়ালি বিবিসি-কে বলেন, ‘নেপাল আর ভারতের মধ্যে সীমানা নিয়ে যে বিবাদ রয়েছে, তা সমাধান করতেই হবে। যতদিন না এর মীমাংসা হচ্ছে, ততদিন এই ইস্যুটা ফিরে ফিরে আসবে। সীমান্ত সমস্যার সমাধান না হলে দুই দেশের সম্পর্ক বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে না।’
প্রদীপ কুমার গ্যায়ালি বলেন, ‘ইতিহাসের যেসব অমীমাংসিত সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকারের ওপর এসে পড়েছে, সেগুলোর সমাধান করতেই হবে। কিন্তু নেপাল এটা চায় না যে, সীমান্ত সমস্যার কারণে দুই দেশের বাকি সব সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যাক। সেগুলোকে সচল রেখেই সীমান্ত সমস্যা মেটাতে হবে, আবার অন্যদিকে লিপুলেখ ও কালাপানি- এই ইস্যুটাও নেপালের সার্বভৌমত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
সীমান্ত নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে মতভেদ চলছে, তার মধ্যেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি মন্তব্য করেছিলেন যে তাকে পদচ্যুত করতে একটা ষড়যন্ত্র চলছে দিল্লিতে আর কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাসে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, সত্যিই কি নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছিল ভারত?
প্রদীপ গ্যায়ালির জবাব ছিল, ‘আমার মনে হয় ভারতীয় নিউজ চ্যানেলগুলোতে ওই সময়ে যে ধরনের খবর প্রচারিত হচ্ছিল, তার দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ওলি। নেপালের পক্ষে খুবই অপমানজনক খবর দেখানো হচ্ছিল নিয়মিত। কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অথবা সে দেশের সরকারের সামনে যে সংকট চলছিল, তা নিয়ে এ ধরনের খবর কেন দেখানো হবে!’
ঝানু এই রাজনীতিক বলেন, ‘অন্য দেশের সংবাদমাধ্যম বা সেখানকার কথিত বুদ্ধিজীবীরা কি নেপালের পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে দেবেন? তারা ঠিক করবেন নাকি যে নেপাল কোন দেশের সঙ্গে কী রকম সম্পর্ক রাখবে? নেপালের পররাষ্ট্রনীতি কোনও দ্বিতীয় বা তৃতীয় দেশ তৈরি করে দেয় না।’
নিয়মিতভাবে নেপালবিরোধী খবর প্রচারের দায়ে কয়েক বছর আগে দেশটিতে কয়েকটি ভারতীয় চ্যানেলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সময়ে ভারত থেকে নেপালের কোনও পণ্যবাহী ট্রাক যেতে দেওয়া হচ্ছিল না - পেট্রোল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব পণ্যের জন্য ভারতের ওপরেই তারা নির্ভরশীল, সেগুলোর সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেটা হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির প্রথম দফার সরকারের সময়ে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের দুটি দিক আছে। একটা দিকে অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতগুলোতে যখন দুই দেশের মধ্যে খুব ভালো কাজ হচ্ছে। নেপালে ভূমিকম্পের পরও দিল্লি খুব সাহায্য করেছিল। আবার পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনের ব্যাপারেও ভারতের সহযোগিতা পাচ্ছে নেপাল। কিন্তু অন্যদিকে বেশ কিছু বিষয়ে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে জটিলতাও আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সীমান্ত বিবাদ। আর এটাও ভুললে চলবে না, মোদির প্রথম দফা সরকারের সময়েই কিন্তু নেপালকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।’
নেপালের সঙ্গে ভারতের কেন বিবাদ? দুটি দেশেই তো হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ! এই প্রশ্নের জবাবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্কটা খুবই গভীর; এটা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। কিন্তু সংস্কৃতি আর ধর্ম মেশালে চলবে না, দুটো পৃথক ব্যাপার।
তার ভাষায়, ‘ধর্মকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেমন টেনে আনা উচিত নয়, তেমনি অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় বিষয় আনা উচিত নয়।’
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে ভারতের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছিলেন, হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে নেপালের যে পরিচিতি, তা টিকিয়ে রাখাই উচিত। তবে নেপালের বর্তমান সরকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ধর্মীয় বিষয় টেনে আনতে আগ্রহী নয়। সূত্র: বিবিসি বাংলা।








