দক্ষিণ পূর্ব ইংল্যান্ডে দ্রুত করোনা সংক্রমণের পেছনে করোনার একটি নতুন রূপ ধরা পড়েছে। অবশ্য মহামারি শুরুর পর ভাইরাসটি পরিবর্তিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়।
এর আগেও কোভিড-১৯-এর জিনগত উপাদানগুলোর পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিবর্তন ভাইরাসটির সংক্রমণের সক্ষমতারও তারতম্য ঘটায়।
আমাদের কী উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
ভাইরাসের ক্ষেত্রে মিউটেশন বা পরিবর্তন সাধারণভাবে ভীতিকর মনে হলেও এটি বাজে জিনিসই হবে; এমন কোনও কথা নেই।
প্রতিটি ভাইরাসই পরিবর্তিত হয়। কেননা, এটি যখন কোনও হোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, তখন এটি নিজের নতুন কপি তৈরি করে যা অন্য কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারে। করোনভাইরাসের মতো আরএনএ ভাইরাসগুলোর অনুলিপি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে থাকে।
কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বা রূপান্তর ভাইরাসটিকে এমনকি দুর্বলও করে তুলতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে, এই মিউটেশন ভাইরাসটিকে আরও সংক্রামক করে তুলতে পারে বা আরও গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
কোভিড-১৯ প্রতি সপ্তাহেই তার রূপ বদল করছে। অনেকগুলো মিউটেশন ভাইরাসে কোনও প্রভাব ফেলেনি। যুক্তরাজ্যে পাওয়া এই সর্বশেষ রূপান্তরটি অবশ্য ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এখনও এটি ভ্যাকসিনের প্রভাবকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
স্কাই নিউজের বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা টমাস মুর বলছেন, এই রূপান্তরটি ‘পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়।’ তবে ‘এটি এমন একটি বিষয় যা তারা খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।’
এখনও পর্যন্ত কোভিড-১৯-এর কমপক্ষে সাতটি বড় গ্রুপ বা স্ট্রেন রয়েছে যা তার মানব হোস্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরের মূল স্ট্রেনটি এল স্ট্রেন নামে পরিচিত। পরে এটি পর্যায়ক্রমে এস, ভি ও জি স্ট্রেইনে পৌঁছায়।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্ট্রেন জি সর্বাধিক প্রকোপ দেখা গেছে। তবে এই অঞ্চলে লোকজনের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের গতি ধীর ছিল বলে ভাইরাসটি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি আবারও জিআর, জিএইচ এবং জিভি স্ট্রেইনে রূপান্তরিত হয়।
চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় এবং চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় মূল এল স্ট্রেইন দীর্ঘদিন এশিয়ায় স্থির ছিল।
ছোটখাটো আরও বেশ কয়েকটি মিউটেশনকে একসঙ্গে স্ট্রেইন ও-তে ফেলা হয়েছে।
ডেনমার্কে কর্তৃপক্ষ মিঙ্ক ফার্মিং-এর সঙ্গে যুক্ত ১২ জনের মধ্যে পাওয়া ভাইরাসের একটি প্রবণতা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল যে, এই মিউটেশনটি কোনও টিকার কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কেননা এটি স্পাইক প্রোটিনে ঘটেছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার দেশটির এক কোটি ৭০ লাখ মিঙ্ককে হত্যার উদ্যোগ নেয়। ডেনিশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় মৃত মিঙ্কদের সামরিক এলাকায় সমাহিত করে। এছাড়া দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় মাসব্যাপী লকডাউন জারি করে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সাধারণ স্ট্রেইনগুলো কী?
জি স্ট্রেইনগুলো এখন বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে ইতালিসহ ইউরোপের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
সাধারণভাবে সবচেয়ে বেশি যে রূপটি দেখা যায় সেটি হচ্ছে ডি৬১৪জি। কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, এই প্রকরণটি ভাইরাসটিকে আরও সংক্রামক করে তুলেছে। তবে অন্য কিছু গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরইমধ্যে পূর্বের স্ট্রেইনগুলো যেমন মূল এল স্ট্রেন এবং ভি স্ট্রেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, অস্ট্রেলিয়া মহামারি মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কার্যকর সামাজিক দূরত্বের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে তখনকার এল ও এস স্ট্রেইন হটাতে সমর্থ হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে দেশের বাইরে থেকে আসা জি স্ট্রেইনের ফলে নতুন সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।
ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর মার্চ মাসের শুরু থেকে এশিয়াতেও জি, জিএইচ ও জিআর স্ট্রেইনগুলো বাড়ছে।
রূপান্তরগুলো কী ভ্যাকসিনকে প্রভাবিত করবে?
এখনও পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা এমন কোনও ভ্যারিয়েন্ট খুঁজে পাননি যা কোনও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ভাইরাসটি পরিবর্তনের গতিও ধীর হয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যে পাওয়া নতুন স্ট্রেইনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইংল্যান্ডের চিফ মেডিকেল অফিসার প্রফেসর ক্রিস হুইটি বলেন, ভ্যাকসিনের ওপর এর প্রভাব থাকলে সেটি হবে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার। দ্রুত এ সংক্রান্ত আরও শক্ত ডাটা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কোভিড -১৯ এর স্ট্রেইন সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা সমন্বয় করেছিলেন বোলগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফেডেরিকো জিওরজি। সায়েন্স ডেইলিকে তিনি বলেন, ‘সারস-কোভ-২ করোনাভাইরাস সম্ভবত ইতিমধ্যে মানুষকে প্রভাবিত করার অনুকূল অবস্থায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিনসহ আমরা যে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন করছি সেটি সব ভাইরাস স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে।
শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের একদল বিজ্ঞানীর পরামর্শ, জি স্ট্রেনগুলো একটি ভ্যাকসিনের জন্য আরও ভাল টার্গেট তৈরি করতে পারে। কারণ এই স্ট্রেনগুলোর পৃষ্ঠে আরও স্পাইক প্রোটিন রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন জেনেটিক্স ইনস্টিটিউটের গবেষক লুসি ভ্যান ডর্প বলেন, আমাদের এখনও সজাগ থাকতে হবে এবং নতুন কোনও পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিশ্চিতের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং এর পরিবর্তনের আশঙ্কা কমিয়ে আনা।
মেলবোর্নের ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অনুষদের এপিডেমিওলজির চেয়ার ক্যাথরিন বেনেট। তিনি বলেন, ‘যদি ভাইরাসটি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন হয় বিশেষত স্পাইক প্রোটিনগুলো, তবে এটি কোনও ভ্যাকসিন থেকে বাঁচতে পারে।’ সূত্র: স্কাই নিউজ।








