যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হয়ে মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নির্বাচনি সমাবেশে নানা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের জন্য এরইমধ্যে বেশ কয়েকবার সমালোচিত হয়েছেন তিনি।সিরিয়া-ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য বহুদিন থেকেই সমালোচিত হয়ে আসছেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিরীয় শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেন তিনি। মাস দুয়েক আগে এক নির্বাচনি সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানোর পর দেশ ও দেশের বাইরে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েন ট্রাম্প। এবার সে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন ভারতীয় অভিবাসী চন্দ্রা গাঙ্গুলি। ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত চন্দ্রা একজন লেখক ও ব্লগার। লৈঙ্গিক বৈষম্য, সংস্কৃতি পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে লেখালেখি করে থাকেন তিনি। ট্রাম্পের কাছে চন্দ্রার লেখা খোলা চিঠিটি প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সেই চিঠিটি পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল।
প্রিয় ডোনাল্ড ট্রাম্প,
আশা করি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আপনার প্রচারণা শিগগিরই শেষ হবে এবং আপনি আপনার টাওয়ারে ফিরবেন।
সম্প্রতি বিমানবন্দরের একটি কফি শপে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি মুসলিম কিনা। আর আমার তখন আপনার কথা মনে পড়ে গেলো। আমি মুসলমান নই। কিন্তু আপনি দেখেন আমার গায়ের রং বাদামি। আর সেকারণে আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়। কিন্তু এ প্রশ্নটা কোনও সাদা চামড়ার মানুষকে করা হয় না। আর তা দিয়ে আপনি বুঝতেই পারছেন প্রশ্নটা শুনতে কেমন লাগে?
এ প্রশ্নটি এক মুহূর্তে মানুষকে পর করে দেয়, বহিরাগত হওয়ার উপলব্ধি তৈরি করে দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় ‘আমি আমেরিকান’ এ উত্তরটি দিই। কিন্তু আবার মনে হয় আপনাদের মতো মানুষদের জন্য এ উত্তরটি যথেষ্ট নয়।
আপনি মুসলিমদেরকে নিয়ে যা যা বলেছেন সেগুলো আমি একত্রিত করেছি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনের হামলা প্রসঙ্গে আপনি বলেছিলেন- ‘আমি ক্লিপ দেখেছি, অনেকেই দেখেছেন, কেউ কেউ সরাসরিও দেখেছেন। রাস্তায় রাস্তায় মুসলিমরা উল্লাস করছিলো।’ যদিও আপনার এ অভিযোগ আগেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিলো তারপরও আপনি বলেছেন।
এবার আসা যাক ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের কথায়। স্যান বারনারডিনোতে হামলার পর আপনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সজাগ হতে হবে, আরও সতর্ক হতে হবে, কঠোর হতে হবে এমনকি কট্টর হতে হবে যেনও আপনারা শনাক্ত করতে পারেন তারা মুসলিম কিনা।’
জনাব ট্রাম্প, আমাদের মতো বর্ণের মানুষরা আরও আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময়ে কঠোরতার শিকার হয়ে আসছি।
মুসলিম সন্দেহেই কী হত্যা করা হয়েছিল ওই শিখ ব্যক্তিকে? দাদার বয়সী এক লোক হাঁটতে গিয়ে পুলিশের পিটুনির শিকার হলেন, তা কি তার গায়ের রং বাদামি দেখে নাকি তিনি ইংরেজী পারেন না তাই? আর কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার কথাগুলো আর নাইবা বললাম। যুক্তরাষ্ট্রে আমি এতো বছর ধরে আমি আছি। অথচ তারপরও আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়, আমাকে আমার কথা বার বার বলতে হয় তার কারণ আমার ইংরেজি বোধগম্য নয়। আমাকে আস্তে বলতে বলা হয় কারণ নাখি আমি বিদেশি স্বরে খুব দ্রুত কথা বলি।
অনেকসময় আমাকে চুপও থাকতে হয়, কারণ যখন আপনি বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত হবেন তখন জোরে কথা বলা আতঙ্কের। এটি বিপজ্জনক হতে পারে তবে তারপরও আমাকে কথা বলতে হবে। কারণ আপনি যা বলছেন তা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের ক্ষেত্রে আমার জন্য হুমকির হতে পারে।
আমি কোনও রাজনৈতিক ভাষ্যকার নই্। তবে আপনাকে বিজয়ী বলে ধরে নিচ্ছি। আপনি সে মানুষ যে কিনা লোকজনকে দেশে ফেরত পাঠাতে চান, যিনি লোকজনকে পরাজিত বলে উল্লেখ করেন, সামনের মানুষদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেশ থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি ‘পরবাসী’দের শক্তিকে অবহেলা করছেন। আপনি আমাদের চলে যেতে বলতে পারেন না, আপনি আমাদের পরাজিত বলতে পারেন না। এটা আপনার কোনও শো নয়। আমরা এ পরবাসীরা আপনার মতোই আমেরিকান। বলা চলে আরও বেশি কিছু। কারণ আমরা এ পরবাসীরাই যে নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তা মেনে চলি। স্বাধীনতা আর সমতার নীতি আমরা মেনে চলি। আমাদেরও কণ্ঠ আছে এবঙ তা একত্রিত হবে।
তাই শুনুন ট্রাম্প, আমরা অভিবাসীদের দেশ, আমরা সবাই আমেরিকান এবঙ এটি আমাদের দেশ। আমাদের মাঝে কেউ ব্যাধির মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারবে না। আতঙ্ক, রাগ, দমন, বর্ণবাদ এবং ঘৃণা শরীরের আগেই মানুষের আত্মাকে মেরে ফেলে। আমরা আপনার বর্ণবাদী মন্তব্য দিয়ে ভয় পাব না। ধর্ম ও বর্ণের ভিন্নতা দিয়ে পরবাসীদের হুমকি বলে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
শুনুন ট্রাম্প, শার্লি এবদো, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার এবং আমি, আমিও মুসলিম। সূত্র: এনডিটিভি
/এফইউ/








