তারা সমেত কাস্তে-হাতুড়ি চাইছে হাতে ধরা দিতে। সেই হাত, যার সম্পর্কে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা আশির দশকে স্লোগান তুলত- ‘এই যে হাত, দেয় না ভাত, একটাই গুণ, করে শুধু খুন!’ সেই হাত তাদের কাছে ছিল ‘কালো হাত’, যা ভেঙে, গুঁড়িয়ে দেওয়াই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, প্রকৃত মোক্ষলাভ। তা হলে সেই হাতকে কি এখন আর খুনির হাত বলে মনে হচ্ছে না? সেই হাতের কালি কি ধুয়ে গেছে? নাকি কালো আর খুনি হাতের চেয়ে আরও ভয়ংকর, পরাক্রমী কোনও শত্রুর মোকাবিলা করতে হাত ধরা ছাড়া উপায় নেই!
সহজ কথাটা সহজ ভাবেই বলে দেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়াই করতে চাইছে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট। সিপিএমের নির্বাচনী প্রতীক কাস্তে-হাতুড়ি-তারা আর কংগ্রেসের হাত। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের অন্যতম শীর্ষনেতা গৌতম দেবই কথাটা প্রথম বলেছিলেন প্রায় বছর খানেক আগে। তার বক্তব্য ছিল, সিপিএম তথা বামফ্রন্টের একার পক্ষে মমতাকে হারানো সম্ভব নয়। অতএব কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেই লড়তে হবে। ক্রমশ ওই অবস্থানের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গে পার্টির অধিকাংশ নেতাই সায় দেন।
কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে জোট পশ্চিমবঙ্গের নেতারা বাঁধতে চাইলেই তো হবে না, সিপিএম একটা সর্বভারতীয় পার্টি বলে কথা। কমিউনিস্ট পার্টিতে নাকি শৃঙ্খলা বলেও একটা ব্যাপার আছে। তাই, এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আজ আর আগামীকাল নয়াদিল্লিতে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসছে। সেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় ‘বসিল পুন যতেক গুণবন্ত’- অনেকটা তার মতো। আগামীকাল, বৃহস্পতিবার এই ব্যাপারে পার্টি তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে। তবে না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
আসলে দশচক্রে ভগবান ভূত হন, জানা কথা। কিন্তু কংগ্রেস আর সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে হাতে হাত মেলাবে, এটা চার বছর আগেও ভাবা অসম্ভব ছিল। রাজনীতিতে প্রকৃতিগতভাবেই পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী এই দু’পক্ষকে প্রায় মেলালেন যিনি, তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিপিএম ও কংগ্রেসের সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের অলিখিত একমেবাদ্বিতীয়ম ‘কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম’ বলে যদি কিছু থাকে, তা হলে সেটা পশ্চিমবঙ্গের মসনদ থেকে মমতাকে হটানো।
কিন্তু কংগ্রেস তো মমতার আদি দল। ওই দল ভেঙে বেরিয়ে এসেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন ১৯৯৮-এর জানুয়ারিতে। এই কংগ্রেসের সঙ্গে তিনি ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জোট বেঁধে লড়েছেন, ২০০৯-এ লড়েছেন ও সে বার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক হয়েছেন, ২০১১-র বিধানসভা ভোটেও জোট বেঁধে লড়ে জিতে কংগ্রেসের সঙ্গে এক বছর চার মাস রাজ্যের সরকার চালিয়েছেন। ২০১২-র সেপ্টেম্বরে মমতা কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর পশ্চিমবঙ্গেও মমতার সরকার ছেড়ে বেরিয়ে যায় কংগ্রেস। তবে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব অর্থাৎ সোনিয়া গান্ধী-রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মমতার সম্পর্ক কখনও খারাপ হয়নি।
সেই মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে সিপিএমের সঙ্গে জোট বাঁধতে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতারাও এত উদগ্রীব কেন? দু’টো দলই বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার তৃণমূল সরকারের অপশাসন, দুর্নীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গকে মুক্তি দিতেই এই জোট হওয়া জরুরি। কিন্তু আসল কারণ অন্য।
সিপিএম জানে, যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতায় ফিরতে না পারলে এই রাজ্যে পার্টির ক্রমাগত ক্ষয় ঠেকানো মুশকিল। ১৯৭৭ থেকে ২০১১, টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এখন দূরে থাকার যন্ত্রণা ও সমস্যা কী, সিপিএম সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থেকে সিপিএমের হাল হয়ে গেছে ইন্দিরা-রাজীব গান্ধী জমানার কংগ্রেসের মতো। রাজ্যপাট হারালেই যে দলের ভিত টলমল করে ওঠে।
পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের আবার সংকট অন্য। তারা বুঝতে পেরেছে, মমতাকে না ঠেকালে তিনি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দলটাকেই কার্যত গিলে নেবেন। গত পাঁচ বছরে কংগ্রেসের বহু দলীয় সংগঠক, পুরসভার কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সদস্য, বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। কংগ্রেসের উপলব্ধি, মমতার একার ক্ষমতা যত বাড়বে, রাজ্য রাজনীতিতে তারা ততই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। অন্যভাবে, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস বলতে শুধু থাকবে তৃণমূল কংগ্রেসই।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি ও কংগ্রেস হাইকমান্ড এখনও এই জোটের ব্যাপারে সম্মতি দেয়নি। কিন্তু সিপিএম-কংগ্রেস জোট হলেই কি মমতাকে হারানো যাবে? (চলবে...)
/এজে/








