ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সিরিয়ায় পাচার করা হচ্ছে। তাদের জোর করে গৃহস্থালী কাজকর্ম করানোর পাশাপাশি যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে জর্ডান ও লেবাননের মতো দেশগুলোতে পাঠানোর কথা জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সিরিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে দরিদ্র এসব নারীর কাছ থেকে নিয়োগ ফি বাবদ আদায় করা হচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল গোলাম সারোয়ারের বরাত দিয়ে বাংলাদেশি নারীদের মধ্যপ্রাচ্যে পাচারের এমন খবর তুলে ধরেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এদিকে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক খবরটি নিশ্চিত করে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত বছরের জুন ও জুলাই মাসে দু’টি পাচারকারী চক্রের সদস্যদের আটক হয় ও পাচারের জন্য তাদের হাতে থাকা কয়েকজন নারীকেও উদ্ধার করা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, র্যাবের অধিনায়ক জানান, গত বছর সিরিয়ায় নির্যাতন, পিটুনি এবং ধর্ষণের শিকার হওয়া ৪৫ জন নারীর খোঁজ পেয়েছেন তারা। এ ঘটনায় প্রথম অভিযোগটি করেন শাহিনুর নামের এক নারী। সিরিয়ায় বন্দিদশা থেকে পালানোর পর মাকে দিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
র্যাবের অধিনায়ক বলেন, ‘শাহিনুরের লেবানন যাওয়ার কথা ছিল। তা না করে আরও ৫ নারীর সঙ্গে তাকে দুবাই পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে সিরিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে অন্য লোকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কখনও তিনি দাসী হিসেবে কাজ করেছেন, কখনও আবার যৌনদাসী হিসেবে। তিনি জানিয়েছেন এমন আরও নারী ছিলেন সেখানে।’
সারোয়ার জানান, ৩৪ বছর বয়সী ওই নারী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং চলাফেরা করতে পারছিলেন না। সিরিয়ায় নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন। পরে এখানে তার কিডনিজনিত জটিলতার চিকিৎসা করা হয়।
যেভাবে পাচার করা হয়
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী ৮০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন। এদের বেশিরভাগই উপসাগরীয় আরব দেশ, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মরত আছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকে স্বেচ্ছায় ভিন দেশে পাড়ি জমালেও শেষ পর্যন্ত তাদের জোর করে বিভিন্ন কাজে বাধ্য করা হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি নারীদের সাধারণত গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
সারোয়ারের মতে, সিরিয়ায় গত ৫ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকায় পাচারকারীদের জন্য এটি নতুন এক গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি নিয়োগকারী সংস্থাগুলোকে (রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি) ব্যবহার করে এসব পাচারকারী জর্ডান ও লেবাননের মতো দেশে লোকজনকে বৈধভাবে পাঠিয়ে থাকে। এরপর এসব দেশের পাচারকারীরা নারীদের সিরিয়ায় পাচার করে দেন। সেখানে ওই নারীদের বেচাকেনা চলে। একজনের হাত হয়ে আরেকজনের হাতে পৌঁছান তারা। এক্ষেত্রে পালানোর সুযোগ খুব কমই থাকে।
কোন ধরনের নারীরা পাচারের শিকার হচ্ছেন?
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সারোয়ার জানান, যেসব নারী পাচারের শিকার হন তারা বেশিরভাগই অত্যন্ত দরিদ্র গ্রামীণ নারী। মাসে ২শ’ ডলার বা ১৬ হাজার টাকা বেতনের এক বছরের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়োগ ফি বাবদ তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
‘তারা সিরিয়া সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তারা ভাবেন, উন্নত জীবনের জন্য লেবানন কিংবা জর্ডানে যাচ্ছেন।’ বলেন সারোয়ার।
পাচারকারী চক্র গ্রেফতার
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত বছরের জুন মাসে প্রথম দফায় ১১ জন ও দ্বিতীয় দফায় জুলাইয়ে আরও পাঁচজনকে পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পাচারকারী চক্রে দু’টি ট্রাভেল এজেন্সির মালিকও রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত সিরিয়া, লেবানন ও জর্ডানের পাচারকারী চক্রকে শনাক্ত করা যায়নি।
/এফইউ/এজে/আপ-এনএস/








