জর্জিয়ায় গত বছর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তে রাজধানী তিবলিসির সড়কে নেমে আসা বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমনে ব্যবহৃত জলকামানে ওই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সে সময় আক্রান্ত এক বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেন, পানিটা গায়ে পড়লে জ্বালা করছিল, যা সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে উপশম করাও সম্ভব হয়নি।
আক্রান্ত বিক্ষোভকারীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শ্বাসকষ্ট, কাশি, বমির উপসর্গের কথাও জানিয়েছেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস রাসায়নিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনীর হুইসলব্লোয়ার এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী কিছুদিন ব্যবহৃত রাসায়নিক, যা ফরাসি সেনাবাহিনী “ক্যামাইট” নামে চিহ্নিত করেছিল, সেই রাসায়নিকের ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে।
অবশ্য জর্জিয়ার কর্তৃপক্ষ বিবিসির অনুসন্ধানকে “অবাস্তব” প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, পুলিশ কেবল “বর্বর অপরাধীদের বেআইনি কার্যক্রমের” বৈধ জবাব দিয়েছে।
ক্যামাইট প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল ফ্রান্স। এরপর তা ব্যবহারের তেমন কোনও নথি নেই। ধারণা করা হয়, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ১৯৩০ এর দশকে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ক্যামাইটের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয় সিএস গ্যাস, যা ‘টিয়ার গ্যাস’ নামে পরিচিত।
গত বছরের ২৮ নভেম্বর বিক্ষোভ শুরুর সময় তিবিলিসিতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে উপস্থিত ছিলেন কনস্তান্তিন চাকুনাশভিলি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণায় জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে, যদিও ইইউতে যোগদানের বিষয়টি জর্জিয়ার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত। পুলিশ জলকামান, পিপার স্প্রে এবং সিএস গ্যাসসহ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সব পদ্ধতি ব্যবহার করে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. চাকুনাশভিলি জলকামানের স্প্রেতে আক্রান্ত হন। তিনি আগেও বহু বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে তার ত্বকে জ্বালা করছিল, আর ধুয়ে ফেলতে গেলে অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছিল।
অন্যরাও একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন কিনা জানতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একটি জরিপ চালান। প্রায় ৩৫০ জন তার জরিপে সাড়া দেন এবং অর্ধেকের মতো মানুষ জানান যে, তারা ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে এক বা একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন। এই দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গের মধ্যে ছিল মাথাব্যথা, ক্লান্তি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও বমি।
তার গবেষণা পরে পর্যালোচিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সাময়িকী টক্সিকোলজি রিপোর্টসে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।
ড. চাকুনাশভিলি যে ৬৯ জনকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেতে “উল্লেখযোগ্য অস্বাভাবিকতা” পাওয়া গেছে। স্থানীয় সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মীরা আগে অভিযোগ করেছিলেন, জলকামানে অবশ্যই কোনও রাসায়নিক মেশানো হয়েছিল। ড. চাকুনাশভিলির গবেষণা তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়।
তারা সরকারকে ব্যবহৃত পদার্থের পরিচয় প্রকাশের দাবি করেছেন। কিন্তু পুলিশবিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে জর্জিয়ার দাঙ্গা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ হুইসলব্লোয়ার বিবিসিকে এই রাসায়নিকের সম্ভাব্য পরিচয় নির্ধারণে সহায়তা করেন।
বিভাগটির অস্ত্র বিভাগের সাবেক প্রধান লাশা শেরগেলাশভিলি মনে করেন, ২০০৯ সালে পরীক্ষার জন্য জলকামানে তাকে একটি যৌগ ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল, গত বছরের রাসায়নিক সেই একই পদার্থ।
স্পেশাল টাস্কস ডিপার্টমেন্টের ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি ইনভেন্টরি তালিকা সংগ্রহ করে বিবিসি। সেখানে দুটি নামহীন রাসায়নিক ছিল: “কেমিক্যাল লিকুইড ইউএন১৭১০” ও “কেমিক্যাল পাউডার ইউএন৩৪৩৯”—এবং কীভাবে সেগুলো মেশাতে হবে তাও লেখা ছিল।
এই ইনভেন্টরি আসল কিনা তা যাচাইয়ের জন্য বিবিসি এটি দাঙ্গা-পুলিশের আরেক সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দেখায়, যিনি নথিটি সত্য বলে মনে করেন এবং দুটি রাসায়নিককেই জলকামানে ব্যবহৃত পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এই দুটি রাসায়নিকের মধ্যে একমাত্র যেটি কখনো দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের রেকর্ড পাওয়া যায় তা হলো ব্রোমোবেঞ্জিল সায়ানাইড, যা ক্যামাইট নামে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ তৈরি করেছিল।
এ বিষয়ে বিবিসি শরণাপন্ন হয়েছিল বিশ্বখ্যাত টক্সিকোলজি ও রাসায়নিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্রিস্টোফার হোলস্টেজ। ড. চাকুনাশভিলির গবেষণা, ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, পুলিশ ইনভেন্টরি এবং শেরগেলাশভিলির পরীক্ষার বিবরণ- সবকিছু পর্যালোচনা করে তিনি মনে করেন, জলকামানে ক্যামাইট ব্যবহারের দিকেই ইঙ্গিত করে।
আন্তর্জাতিক আইনে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব আছে এমন রাসায়নিক ব্যবহার করার অবশ্য অনুমতি আছে। তবে শর্ত থাকে যে, তার ব্যবহার আনুপাতিক হতে হবে। কিন্তু অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ বিভাগে নিরাপদ ও প্রচলিত উপায় থাকা সত্ত্বেও একটি পুরনো, বেশি শক্তিশালী ও নিষিদ্ধ যৌগ ব্যবহার করা হলে তা রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই অনুসন্ধানের ফল উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস এডওয়ার্ডস। তিনি এর আগেও বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে জর্জিয়া সরকারকে লিখেছেন।
তবে জর্জিয়া সরকার বিবিসির এ অনুসন্ধানকে “চরম তুচ্ছ” ও “অবাস্তব” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী “আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে” থেকে “বর্বর অপরাধীদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের” জবাব দিয়েছে।







