অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বন্ডাই বিচে একটি ইহুদি উৎসবে প্রাণঘাতী হামলার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ইসরায়েলের চাপের মুখে পড়েছেন। এ হামলাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ভেতরে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
সোমবার ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আলবানিজ বলেন, তার সরকার প্রয়োজনীয় যেকোনও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ২০২৩ সাল থেকে বাড়তে থাকা ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় আলবানিজ ‘কিছুই করেননি’।
হামলার পরপরই ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতারা হতাশা প্রকাশ করেন। সিডনির সেন্ট্রাল সিনাগগের প্রধান রাব্বি লেভি উলফ বলেন, দেশটিতে অন্যান্য দেশের মতোই ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহ মাত্রা দেখা যাচ্ছে। রবিবার তার এক বন্ধু সেখানে নিহত হন। তিনি আরও বলেন, যখন উপরমহল থেকে ইহুদিবিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে।
এক সংবাদ সম্মেলনে আলবানিজ তার সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি অপরাধীকরণ এবং নাৎসি স্যালুট নিষিদ্ধ করা। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ইহুদি সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীগুলোর শারীরিক নিরাপত্তার জন্য তহবিল বাড়ানো হবে। বিশ্বের কঠোরতম বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ায় আরও কঠোর বন্দুক আইনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
গত বছর সরকারের নিয়োগ করা বিশেষ দূত জিলিয়ান সেগাল বলেন, সিনাগগ ও ইহুদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিতি এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা মোকাবিলার জন্য তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। রবিবারের সন্ত্রাসী হামলা হুট করে হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণশীল লিবারেল বিরোধী দলের নেতা সুসান লে বলেন, লেবার সরকার ইহুদিবিদ্বেষকে ‘বাড়তে দিয়েছে’। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজ থেকে সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়ার ধরনে সবকিছু বদলাতে হবে। আলবানিজকে সেগালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মনোযোগ দিয়ে।
জুলাইয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সেগালের পাশে দাঁড়িয়ে আলবানিজ ইহুদিবিদ্বেষকে ‘মারাত্মক অভিশাপ’ বলে নিন্দা করেন। তিনি বলেন, তার সরকার ইহুদি সম্প্রদায়ের স্থাপনা, যেমন স্কুলগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে ২৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার ব্যয় করবে।
তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধ সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষ থেকে আলাদা করা জরুরি। তিনি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতারা ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন। জুলাইয়ে তিনি বলেন, বিদেশের ঘটনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। কিন্তু কেউ যদি শুধু ইহুদি হওয়ার কারণে কাউকে দোষারোপ করে, তাহলে সীমা লঙ্ঘন হয়।
ঘৃণামূলক অপরাধের আইন কঠোর করার পাশাপাশি সেগাল ভিসা আবেদনকারীদের ইহুদিবিদ্বেষী মতামতের কঠোর পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রচার মাধ্যমে মনোযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার জাতিগত বৈষম্য কমিশনার গিরিধরন সিভারামনসহ কিছু সমালোচক বলেন, কিছু প্রস্তাব মানবাধিকারের উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে এবং সব ধরনের জাতিগত বৈষম্যই অভিশাপ।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার ২ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ইহুদি পরিচয়ধারী প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৭ জন, অর্থাৎ ০.৪৬ শতাংশ। তারা মূলত সিডনি ও মেলবোর্নের অভ্যন্তরীণ এলাকায় বাস করেন।
লেবার সরকার অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতি সচেতন, বিশেষ করে লেবানন থেকে আগত অভিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি। ২০২৩ সাল থেকে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সিডনিতে সাপ্তাহিক বিক্ষোভ মিছিলের অনুমতি দিয়ে আসছে।
আগস্ট থেকে অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েল সম্পর্ক উত্তপ্ত। তখন ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অস্ট্রেলিয়ান কূটনীতিকদের ভিসা বাতিল করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এটাকে ‘অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া’ বলেছিলেন। কারণ অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
একই মাসে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী অন্তত দুটি ইহুদিবিদ্বেষী অগ্নিসংযোগের জন্য ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে দায়ী করে অস্ট্রেলিয়া ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে।
অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণশীল দলগুলো বড় দিনের আগে নতুন অভিবাসন নীতি ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে জনমত জরিপে উত্থান হওয়া অভিবাসনবিরোধী পপুলিস্ট ওয়ান নেশনের চাপের মুখে তারা এমনটা করতে পারে।
ওয়ান নেশনের সিনেটর পলিন হ্যানসন সোমবার বলেন, সীমান্ত নীতিতে সরকারের দুর্বলতাই বন্ডাই হামলার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, কে দেশে আসবে, সে ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, অভিযুক্ত ২৪ বছর বয়সী বন্দুকধারী অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তার বাবা দ্বিতীয় সন্দেহভাজন এবং হামলায় নিহত হন। তিনি ১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসা একজন বাসিন্দা।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর অনুযায়ী সিরিয়ান মুসলিম আহমেদ আল আহমেদ নামে এক পথচারী বন্দুকধারীদের একজনকে নিরস্ত্র করেছেন বলে প্রশংসা পেয়েছেন।
সাবেক লিবারেল প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল সংসদে বন্ডাইর বড় ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি বলেন, একক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধ করা খুব কঠিন।









