যৌন নিপীড়ন ও গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর করিম খানকে পদচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ নানা বিতর্কের পর শুক্রবার আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশের ভোটে তাকে বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খবর এপি।
এমন এক সময়ে ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টারকে অপসারণ করা হলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা এবং ভেনেজুয়েলার আদালত ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় কার্যত অস্তিত্বসংকটে পড়েছে বিশ্বজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিতকারী এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
যে অভিযোগে বরখাস্ত করিম খান
সহকারীর সঙ্গে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক এবং পরবর্তীকালে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল করিম খানের বিরুদ্ধে। যদিও শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন তিনি। আইসিসির তদারকি সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিস’ বিবৃতিতে জানায়, ‘গুরুতর অসদাচরণ ও দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার’ কারণেই এই অপসারণ।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচারবিষয়ক পরিচালক লিজ এভেন্সন বলেন, “আইসিসির উচিত সর্বোচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখা। কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ রাখা এবং যেকোনও ধরণের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এর অন্যতম শর্ত।”
তবে করিম খানের আইনি দল পুরো প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ না দিয়েই অগণতান্ত্রিকভাবে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছে এবং তারা এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই চালাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন হামলা ও নিষেধাজ্ঞার খড়গ
করিম খানের বরখাস্তের পেছনে কেবল অভ্যন্তরীণ নৈতিক বিতর্কই নয়, রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক কূটচক্রও। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করার পর থেকেই ওয়াশিংটনের তোপের মুখে পড়েছিল আইসিসি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইতোপূর্বেই করিম খানসহ আদালতের ১৩ জন কর্মকর্তার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আইসিসিকে ‘নিষ্ক্রিয় ও নিষ্ফল’ করতে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছে ওয়াশিংটন। রুবিও হুমকি দিয়েছেন, মিত্র দেশগুলোকে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার অস্বীকার করতে চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
আদালত থেকে ভেনেজুয়েলার প্রস্থান
আইসিসি যখন প্রসিকিউটর পদচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই সংস্থাটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেলিক্স প্লাসেনসিয়া অভিযোগ করেন, আইসিসি ভৌগোলিক বৈষম্য করছে এবং বৈশ্বিক উত্তরের (পাশ্চাত্য) স্বার্থ রক্ষা করে কেবল আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার ওপর নজর দিচ্ছে।
নেতানিয়াহুর পরোয়ানায় কোনও প্রভাব পড়বে কি?
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইসিসির চিফ প্রসিকিউটর অপসারণের প্রভাব ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে ইস্যু করা গ্রেফতারি পরোয়ানায় সরাসরি পড়বে না। কারণ করিম খান অপসারিত হলেও বিচারকদের অনুমোদিত গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল করার এখতিয়ার কেবল আইসিসির বিচারক প্যানেলেরই রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ, নতুন প্রসিকিউটর নির্বাচন এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর সরে দাঁড়ানোর ফলে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ওপর বড় ধরণের কালো ছায়া নেমে এসেছে।









