উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের ওপর দিয়ে আরও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। জাতিসংঘের নিন্দা ও যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে এ হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, জাপানের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক অভিযানের শুরু মাত্র।
কিম জং-উন বলেন, মঙ্গলবার জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপের ওপর দিয়ে যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম দ্বীপের সামরিক ঘাঁটি। এ ঘাঁটিতে পরমাণু হামলা চালানোর প্রথম ধাপ এটি।
উত্তর কোরিয়ার বার্তাসংস্থা কেসিএনএ কিম জং-উনের বিবৃতি উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার বিরুদ্ধে জবাবও দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী পিয়ংইয়ং থেকে এই প্রথমবার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নির্দেশ দেন কিম জং-উন। নির্দেশে তিনি জানান, প্রশান্ত মহাসাগরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নজর রেখে আরও পরীক্ষা চালানোর প্রয়োজন।
কোরিয়ান পিপল’স আর্মির (কেপিএ) সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে বলতে গিয়ে কিম জং-উন বলেন, সাম্প্রতিক বিধ্বংসী রকেট উৎক্ষেপণের মহড়া প্রকৃত যুদ্ধের মতোই এবং এটি প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়ামে হামলার প্রথম ধাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের হুমকি দিলে এ মাসের প্রথম দিকে গুয়ামের পাশে ঘাঁটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেয় উত্তর কোরিয়া। হামলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে পিয়ংইয়ং দাবি করলেও শেষ পর্যন্তু তারা কোনও হামলা চালায়নি। এ থেকে মনে করা হচ্ছিল, পরিস্থিতি হয়তো শান্তি হয়েছে।
কিন্তু মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়া হোয়াসং-১২ নামে যে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, তা কিম জং-উন গুয়ামে হামলায় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তবে এটি নিক্ষেপের পথ ছিল আলাদা। জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপের ওপর দিয়ে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসিন দলের মুখপত্র রোদোং সিনমুন সংবাদপত্র বুধবার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ২০টির বেশি ছবি প্রকাশ করেছে।
মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, উত্তর কোরিয়ার ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি সর্বোচ্চ সাড়ে ৫শ’ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে প্রায় ২ হাজার ৭শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে।
ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ‘হুমকি ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার শাসক আঞ্চলিক ও বিশ্ব থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে যেকোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে।’
উত্তর কোরিয়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর জাপান জরুরি সতর্কতা জারি করলেও ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই ধ্বংস করার কোনও উদ্যোগ নেয়নি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে এ ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ার আগে প্রায় ১৪ মিনিট জাপানের লোকালয়ের উপরে ছিল। এ জন্য আগেই জাপান সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সতর্ক করে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো হয়।
জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়াশিদা সুগা টোকিওতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এভাবে আর চুপ থাকা যায় না। আমরা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলব।’
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক সামরিক মহড়া চলার মধ্যেই উত্তর কোরিয়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে ২০০৯ সালের পর এবারই দেশটি জাপানের ওপর দিয়ে এ পরীক্ষা চালালো। এর আগে ১৯৯৮ ও ২০০৯ সালে উত্তর কোরিয়ার ছোঁড়া দুটি রকেট জাপানের আকাশ সীমা অতিক্রম করে। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, সেগুলো কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, অস্ত্র হিসেবে নয়।
এদিকে, মঙ্গলবারের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। এর আগে আন্তঃমহাদেশীয় বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নিরাপত্তা পরিষদ। এর আগে উত্তর কোরিয়ার রফতানি এবং বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদারে এ মাসের গোড়ার দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে সপ্তম দফার অবরোধ আরোপ করে। সূত্র: বিবিসি।








