আফগান শান্তি আলোচনায় বসতে দুইটি পূর্বশর্ত বেঁধে দিয়েছে তালেবান। তাদের প্রথম শর্ত: আফগান কর্তৃপক্ষ নয়, আলোচনা হবে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। আফগান তালেবানের একজন শীর্ষ নেতা আল জাজিরাকে বলেছেন, দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে শান্তি আলোচনার কেন্দ্রীয় বিবেচ্য হিসেবে দেখছে তালেবান। সে কারণেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চাইছে। তালেবানের দ্বিতীয় শর্ত অনুযায়ী আলোচনাস্থল হতে হবে তাদের দোহার কার্যালয়। আল জাজিরা জানিয়েছে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দোহা কার্যালয় বন্ধে কাতারের সঙ্গে আফগান কর্তৃপক্ষের দেনদরবারের খবর প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতেই দ্বিতীয় শর্তটি জুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আফগান কর্তৃপক্ষ দোহা কার্যালয় বন্ধের পাশাপাশি নিজেরাই তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়। তালেবান হুমকি দিয়েছে, সরাসরি আলোচনা না হলে তারা শান্তি প্রস্তাবই ফিরিয়ে নেবে।
আফগান তালেবান সদস্যদের কাতারের রাজনৈতিক অফিসেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চায়। দোহার শীর্ষস্থানীয় তালেবান নেতা মঙ্গলবার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে রক্তপাত বন্ধে একটি ‘শান্তিপূর্ণ সমাধানের’ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের তালেবান সদস্যরা তাদের দোহার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
তালেবানদের দোহার অফিস বন্ধ করিয়ে দেওয়ার জন্য কাতার সরকারের সঙ্গে আফগান সরকারের আলোচনার খবর গত শুক্রবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর তালেবান নেতা কাতারে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার এই সিদ্ধান্ত জানালেন।
প্রকাশিত খবরে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছিল, দোহা অফিস থাকলেও ‘শান্তি আলোচনায় কোনও সুফল আসবে না’ । তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দোহা অফিস বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে আর কোনও কথা বলা হলে, তা তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া শান্তি আলোচনার প্রস্তাবকে পণ্ড করে দেবে। তাছাড়া, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তটি তাদের দেওয়া আলোচনা প্রস্তাব বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত।
তালেবানের দোহার নেতা বলেছেন, ‘আমাদের সংগ্রাম দেশকে মুক্ত করার জন্য। এটি কোনও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়। বিদেশি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে দেশ না ছাড়লে কীভাবে মুক্তিসংগ্রাম সম্পূর্ণ হতে পারে? যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র সরকারই তাদের বাহিনীকে আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক, সেহেতু প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই সরাসরি কথা বলা দরকার। দ্বিতীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আফগান সরকারের সঙ্গে আমরা আলোচনায় বসবো।’
দুই সপ্তাহ আগে আফগান তালেবান সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। আলোচনার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করাতে তালেবান সদস্যরা তাদের চিঠিতে ‘শান্তিকামী কংগ্রেসম্যান’ সম্বোধন করেছিল!
আফগান সরকার ‘আলোচনার জন্য প্রস্তুত’
তালেবানদের প্রস্তাবের কথা জেনে আফগান সরকারের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, তালেবানের উচিত কাবুল সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসা। তালেবান সদস্যরা যেখানে চাইবে সেখানেই কাবুল সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে।
আফগানিস্তানের নেতৃস্থানীয় সংবাদমাধ্যম টোলোনিউজকে প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র হারুন চাখানসুরি বলেছেন, ‘তালেবান সদস্যরা দুইবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে এবং সরাসরি আলোচনায় বসতে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান সরকার বলতে চায়, যদি তারা আফগান হয়ে থাকে তাহলে তারা যেন আফগানিস্তানে আসে। আফগান সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত।’
প্রায় ২৫টি দেশ ও সংস্থার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য বুধবারের আফগানিস্তান শান্তি সম্মেলনের আগে জানা গেল আফগান সরকার ও তালেবান সরকারের এমন ভেতর চলতে থাকা এই বিরোধের কথা। ওই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর অংশগ্রহণ করার কথা।
আশাব্যঞ্জক ফলাফলের কোনও সম্ভাবনা নেই
সাম্প্রতিক যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেসব জেনেও সঙ্ঘাত নিরসনের বিষয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না সাধারণ আফগান নাগরিকরা। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সফলতা নিয়ে তারা সন্দিহান।
কাবুলের ইবনে সিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্বাস আরিফি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘যুদ্ধ যদি এত দীর্ঘদিন ধরে চলে তাহলে শান্তি এতও সহজে আসবে না। কাবুল শান্তি সম্মেলন কিছুই পরিবর্তন করতে পারবে না। আমরা অতীতে দেখেছি, এরকম সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয় আর পরে তা কোন কার্যকর ফলাফল ব্যতিরেকেই শেষ হয়। রাজনীতিবিদরা কথা বলেন, অনুষ্ঠান শেষে হাসি মুখে ছবি তোলেন এবং বলেন শান্তির বিষয়ে তারা আশাবাদী। কিন্তু যুদ্ধি বাস্তবতা আর শান্তি নিছকই স্বপ্ন।’
শান্তি আলোচনায় নারীদের অংশগ্রহণের পক্ষে থাকা কাবুলের বাসিন্দা ফাতিমা রোশানিয়ান বলেছেন, ‘কিন্তু তালেবানরা তো কোনও নারীকে ওই রকম স্থানে মেনে নেবে না। তাহলে কী করে হবে?’
কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ছাত্রী খালিদা কাজিমি তালেবানের সঙ্গে আলোচনার বিরুদ্ধে। কেননা তারা ‘বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে।’ আল জাজিরাকে ফোনে মতামত জানানোর সময় তিনি বলেছেন, ‘তালেবান মানুষ হত্যা করে। আর আফগান সরকার তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে চায়। আমার কাছে এটা খুবই বিস্ময়কর।’








