পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২৫ জুলাই। ধীর ভোট গণনার কারণে এখন পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের ৭৬টি আসনের ফলাফল পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ৪৬টি আসন পেয়েছে। মোট ১১৯টি আসনে তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। ভোট গ্রহণ হয়েছে ৪৯ শতাংশ। পিটিআইয়ের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) নিশ্চিতভাবে পেয়েছে ১৭টি আসন। দলটির প্রার্থীরা মোট ৬১ আসনে এগিয়ে রয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইমরান খানই তার দেশের নেতৃত্ব হাতে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
আল জাজিরার কামাল হায়দার মন্তব্য করেছে, ‘এটা স্পষ্ট, ইমরান খান বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব সম্ভবত তিনিই পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, এতে অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। ইমরানের এই প্রধানমন্ত্রী হওয়া ও পিটিআইয়ের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় দেশটিতে বৃদ্ধি পেতে পারে অস্থিতিশীলতা। আবার তারা পরাজয় মেনে নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এই ভেবে যে দেশের জনগণ ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নতুন দলকে ভোট দিয়েছে।’
কিন্তু আদতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনের ফলাফলকে সহজভাবে নিচ্ছে না। দলগুলোর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই অভিযোগ জানানো হয়েছে। পাকিস্তানের শীর্ষ ধারার রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ (পিএমএল-এন), ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি) এবং ‘মুত্তাহিদা পাকিস্তান মুভমেন্ট-পাকিস্তান’ (এমকিউএম-পি) কারচুপির অভিযোগ এনে প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে মূলত পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে থাকতে না দেওয়া ও তাদের হাতে ভোট গণনার পর পাওয়া ফলাফল না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল-এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ‘ব্যাপক মাত্রায় অনিয়মের ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ থাকায় পিএমএল-এন ২০১৮ সালের নির্বাচনের এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছে। আমাদের কর্মীদের ফরম-৪৫ দেওয়া হয়নি, ফলাফল ঘোষণা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল এবং আমাদের পোলিং এজেন্টদের ছাড়াই ভোট গণনা করা হয়েছে। এটা না সহ্য করার মতো, আর না গ্রহণযোগ্য।’
পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি একই অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনাটি ‘ভয়ঙ্কর ও ক্ষমার অযোগ্য।’ বিলাওয়াল ভুট্টোর একজন মুখপাত্র টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের কর্মীদের ভোট গণনার পর ফল জানতে না দেওয়াটা কোন ষড়যন্ত্রের অংশ?’ এমকিউএম-পি একইভাবে তাদের অনাস্থা জানিয়েছে করাচিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে। দলটির মুখপাত্র ফয়সাল সাবজাওয়েরি দাবি করেছেন, হায়দরাবাদ ও করাচিতে তাদের পোলিং এজেন্টদের ফলাফলের সার্টিফাইড কপি দেওয়া হয়নি।
পিএমএল-এন, পিপিপি, এমএমএ এবং এনপি আগামীকাল ইসলামাবাদে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলন করবে। তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান কয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রশ্নে ন্যাশনাল পার্টির সিনেটর মির হাসিল খান বেজিনজো যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘নির্বাচনে নিশ্চিতভাবেই কারচুপি হয়েছে। আমরা এই ফলাফল মেনে নেব না।’
‘ফ্রন্টিয়ার কর্পস, সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন সবাই মিলেই নির্বাচনে কারচুপি করেছে, বিশেষ করে বেলুচিস্তানে। সারা বিশ্বে পাকিস্তান হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত ফলাফল ঘোষিত হয়নি। জনগণ প্রার্থীদের নির্বাচন করেনি, সেনাবাহিনী প্রার্থীদের বেছে নিয়েছে। বেলুচিস্তানে সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, ফ্রন্টিয়ার কর্পস মিলে কাকে বিজয়ী করা হবে তা নির্ধারণ করেছে। যেমন পিবি-৪৪ আসনে তারা আমাদের সমর্থকদের ভোট দিতে দেওয়া দেয়নি। এমনকি তারা অনেক ভোট কেন্দ্রের ফলাফলও ঘোষণা করেনি। এমন কাজ তারা সারা বেলিচিস্তানে করেছে। কিন্তু আমরা চুপ করে বসে থাকব না বরং গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের জন্য করাই করব।’
মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ইসলামিক দলগুলো নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছে। ধর্মীয় দলগুলোর জোটের পক্ষে ফজলুর রহমান কারচুপির বিরুদ্ধে সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেছেন। ইমরানের পিটিআই ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এমনই অনাস্থা। শুধু নির্বাচনে নয়, নির্বাচনের আগেও পিটিআইয়ের পক্ষে সেনাবাহিনীর ভূমিকা রাখার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ইমরানের দল সরকারগঠনের সুযোগ পেলেও একদিকে ইমরান ও সেনাবাহিনী ও অপরদিকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কতটা অস্থিতিশীল করে তোলে তা বোঝার জন্য নজর রাখতে হবে পাকিস্তানের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে।








