মিয়ানমারের রাখাইনে রবিবার (১৮ নভেম্বর) বাস্তুচ্যুতদের জন্য গড়ে তোলা আশ্রয় শিবিরে গুলি চালিয়েছে সে দেশের পুলিশ। এতে আহত হয়েছে অন্তত চার জন। শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের পাচার করে বাইরে নিয়ে যাওয়ার দায়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে সেখানে গিয়েছিল পুলিশ। তারা দুইজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছেও। পুলিশের দাবি, অভিযানের এক পর্যায়ে রোহিঙ্গারা তরবারি নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণে উদ্যত হয়। তাই তারা গুলি চালিয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানা গেছে মিয়ানমারের পুলিশের দাবি মোতাবেক সেখানে পুলিশের ওপর হামলা চালানোর কোনও ঘটনা ঘটেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘আ নুক ইয়ে ক্যাম্প’ নামের বাস্তুচ্যুতদের শিবিরটি রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মিয়ানমারে পুলিশের ভাষ্য, গত শুক্রবার (১৬ নভেম্বর) দুই ব্যক্তি একটি নৌকায় করে শিবিরের ১০৬ জন রোহিঙ্গাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল মালয়েশিয়ায় যাওয়ার। কিন্তু মিয়ানমার ২৫ শিশুসহ রোহিঙ্গা ভর্তি ওই নৌকাটিকে সমুদ্রেই আটক করে। সেই সূত্রে রবিবার সংশ্লিষ্ট শিবিরটিতে অভিযান চালায় পুলিশ। ২০১৫ সালে একবার মিয়ানমার মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে রকম কঠোর অভিযান শুরু করেছিল, সংশ্লিষ্টরা মনে করেন রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আটক হওয়ার এই ঘটনা সহ সম্প্রতি ঘটা একই রকম ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে মিয়ানমার আবারও কঠোর অভিযান শুরু করতে পারে।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত শিবিরটিতে ঘটা ঘটনাপ্রবাহের একজন প্রত্যক্ষদর্শী মং মং আয়ে (২৭)। তিনি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শিবিরে মিয়ানমার পুলিশের গুলিতে চার জন রোহিঙ্গা আহত হয়েছে। এদের মধ্যে মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার ভাষ্য, ‘শিবিরের রোহিঙ্গারা বাইরে গিয়েছিল দেখার জন্য, যে কি হচ্ছে।’
কিন্তু পুলিশের দাবি, শিবিরে রোহিঙ্গারা তাদেরকে তরবারি হাতে ঘিরে ধরেছিল এবং তাদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করেছিল। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার একটি থানার পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ‘রোহিঙ্গারা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নিতে গেলে পুলিশ প্রথমে ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। আমি শুনেছি, কয়েকজন আহত হয়েছে।’
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী মং মং আয়ে পুলিশের দাবির বিপরীতে বলেছেন, রোহিঙ্গারা পুলিশের কাছ থেকে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। আর পুলিশও ফাঁকা গুলি ছোঁড়েনি।
২০১২ সালে রাখাইনে একবার সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার আশ্রয় শিবিরে এনে রাখে। কিন্তু সেখানে রোহিঙ্গাদের নেই চলাচলের স্বাধীনতা, নূন্যতম চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষার সুযোগ। গত আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ‘সলিডারিটিস ইন্টারন্যাশনাল’ সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, চার হাজার রোহিঙ্গাকে ধারণকারী আহ নুক ইয়ে শিবিরটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ওই শিবিরে মানুষের বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। একদিকে যেমন রয়েছে পানির অভাব, তেমনি রয়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা।
বহু বছর ধরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মার্চ ও নভেম্বর মাসের মধ্যে নৌকায় চড়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ ওই সময় সমুদ্র তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। রোহিঙ্গাদের গন্তব্য মূলত থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া।
রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালে আগস্ট মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে চালানো হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ তাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো নিপীড়নকে ‘জাতিগত নির্মূল প্রচেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত পায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সমঝোতা হলেও রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া দেশে ফেরত যেতে চাইছে না।








