মিয়ানমার সংকট নিরসনে ঐকমত্যে পৌঁছানোর দাবি করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের নেতারা। তারা জানিয়েছেন, জোটের সংঘাতপূর্ণ এই দেশটিতে সহিংসতার অবসানে শনিবার দেশটির জান্তা সরকারের প্রধানের সঙ্গে একটি পরিকল্পনার বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন। তবে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধের দাবিতে তার কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনও প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
আসিয়ান সম্মেলন থেকে বের এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের প্রত্যাশার বাইরে।’
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানান, তারা বর্মি সেনাপ্রধান ও দেশটির জান্তা সরকারের প্রধানকে খুব বেশি অভিযুক্ত না করার চেষ্টা করেছেন। কেননা, কার জন্য সহিংসতা ঘটছে তার চেয়ে সংঘাত থামানোই বেশি জরুরি। ফলে সম্মেলনে সহিংসতার অবসানের দিকেই জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত; এ ব্যাপারে বর্মি সেনাপ্রধানও একমত হয়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্মেলনে আসিয়ান নেতারা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিন অং হ্লাইং-এর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চেয়েছেন। একইসঙ্গে তারা রাজনৈতিক বন্দিদেরও মুক্তি চেয়েছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আসিয়ান নেতাদের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেননি মিন অং হ্লাইং।
আসিয়ানের পক্ষে গ্রুপ চেয়ার ব্রুনাই-এর এক বিবৃতিতে পাঁচটি বিষয়ে ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সহিংসতার অবসান ঘটানো, সব পক্ষের মধ্যে একটি গঠনমূলক সংলাপ, সংলাপের সুবিধার্থে আসিয়ানের পক্ষে একজন বিশেষ দূতের উপস্থিতি, সহায়তা গ্রহণ এবং আসিয়ানের একজন দূতের মিয়ানমার সফর।
বিবৃতিতে উল্লেখিত পাঁচ দফায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। তবে সম্মেলনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি হিসিয়েন লুং সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি (মিন অং হ্লাইং) বলেছেন যে, তিনি আমাদের কথা শুনেছেন। যেটি তার কাছে উপকারী মনে হবে সেটি তিনি গ্রহণ করবেন।’
মিয়ানমারের জান্তা প্রধান দেশটির বিদ্যমান সংকটে আসিয়ানের একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখা বা প্রতিনিধি দল পাঠানো কিংবা মানবিক সহায়তার বিরোধিতা করেননি বলেও জানান সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী।
মিন অং হ্লাইং-এর কাছ থেকে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বার্মার সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি টিভি চ্যানেলের রাতের নিউজ বুলেটিনে আসিয়ান সম্মেলনে জান্তা প্রধানের উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে যে প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হবে; তার বিষয়ে আসিয়ানকে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করবে নেপিদো।
আসিয়ান সম্মেলনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমারের নবগঠিত জাতীয় ঐক্য সরকার। উৎখাত হওয়া আইনপ্রণেতা, গণতন্ত্র মনষ্ক ব্যক্তিবর্গ, সশস্ত্র আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা ও সু চির নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের বেসামরিক নেতারা এই ঐক্য সরকার গড়ে তুলেছেন।
এদিকে মিয়ানমারের রাজবন্দিদের মুক্তি এবং সহিংসতা বন্ধের একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-এর প্রধান চার্লস স্যান্টিয়াগো। তিনি বলেন, আসিয়ানকে এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সহিংসতার অবসানে মিন অং হ্লাইং-এর জন্য একটি স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে কিংবা তাকে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে দেশটি। গত বছরের নভেম্বরে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া অং সান সু চির দলকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করায় সামরিক শাসনের বিরোধিতায় রাজপথে নামে সু চির সমর্থকরা। এখন পর্যন্ত দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে সাত শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে সরকারি বাহিনী। ওই অভ্যুত্থানের পর আসিয়ান সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য বিদেশ সফরে ইন্দোনেশিয়ায় যান জান্তা প্রধান।
শনিবার জাকার্তায় আসিয়ান নেতাদের বৈঠকস্থলের বাইরেও জড়ো হয় মিয়ানমারের সু চি সমর্থকরা। তারা হাড়ি ও পাতিল দিয়ে শব্দ করে। অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, গণতন্ত্র প্রবর্তন কর, আমরা সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রভৃতি। এদিন মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। তবে কোথাও বড় ধরনের কোনও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। সূত্র: রয়টার্স।









