আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় বৃহত্তম শহর হেরাতে তালেবানের উত্থানে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ দেখা দিচ্ছে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে।
ঈদুল আজহার আগে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দেশটির জনগণকে আশ্বস্ত করতে অনেক সময় ব্যয় করেছেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন জেলায় তালেবানের দখল ঠেকাতে সরকারি বাহিনী যখন লড়াই করছে, তখন তিনি এমন উদ্যোগ নিলেন।
সোমবার পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত শহরের সড়কে হাঁটতে দেখা গেছে তাকে। তিনি পথচারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, শিশুদের কোলে তুলে নেন। এমনকি স্থানীয় একটি মিষ্টির দোকানকে অবাক করে দেন। তার এই সংক্ষিপ্ত সফর হেরাতের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হলো।
এই মাসের শুরুতে তালেবানরা প্রাদেশিক রাজধানী হেরাত থেকে ৪৩ কিলোমিটার দূরে জিন্দাজান শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর তারা ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ক্রসিং ইসলাম কালা দখল করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যেসব সীমান্ত ক্রসিং তালেবান দখল করেছে, এটি সেগুলোর একটি। এই দুটি দখলের খবর ৪ লাখ বাসিন্দার প্রাচীন শহরটিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
স্থানীয়রা আশঙ্কা করেন, পরের দিন সূর্যোদয়ের পর তালেবানরা হেরাতের দিকে এগিয়ে আসা শুরু করবে। এই আতঙ্ক এমন পর্যায়ে ছিল যে অনেকেই ঈদুল আজহার ছুটির দিনে মার্কেট ও বাজারে যাওয়া বন্ধ করে দেন।
ঘানির এই সফরের পর ঈদের দিন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীও শহরটি সফর করেন। এতে হেরাতের বাসিন্দাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে: সহযোগিতা আসছে।
যদিও হেরাতের অনেক বাসিন্দার জন্য এই আতঙ্ক এখনও একেবারে বাস্তব।
কাবুল ও হেরাতে বসবাস করা ফরোগ মোহাম্মদি তালেবানের জিন্দাজান শহরের দখল নেওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। ৮ জুলাইয়ের সন্ধ্যাটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে উল্লেখ করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন তালেবানের উত্থান ঠেকাতে যে বিদ্রোহী আন্দোলন শুরু হয়েছে তাতে যোগ দেবেন। আফগানিস্তানজুড়ে কয়েক হাজার মানুষ এই সশস্ত্র আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন।
পরদিন সকালে একটি অফিসে ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা ফরোগ কাঁধে একে-৪৭ নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। শহর ঘিরে রাখা বিভিন্ন জেলায় তালেবানের এগিয়ে আসা ঠেকানোর লড়াইয়ে যোগ দেওয়া লক্ষ্য তার।
তিনি বলেন, আপনি ওই রাতে যদি সেখানে থাকতেন তাহলে বুঝতে পারতেন যে তালেবানের প্রতিটি লক্ষ্যই হলো বড় শহর দখল করা।
বেশ কয়েকজন স্থানীয় জানিয়েছেন, হেরাতের এক ডজনের বেশি জেলায় তালেবানের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। শহরটিকে তুলে ধরতে তারা অবরুদ্ধে ও ফাঁদে আটকা শব্দ ব্যবহার করছেন। তাদের আশঙ্কা, এখনও সশস্ত্র গোষ্ঠীটি শহরের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
হেরাতের এক বাসিন্দা নিজের পরিবারকে কাবুল পালিয়েছেন। তালেবানের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার পর তিনি শহরটি ছেড়ে যান। তার কথা, শহরের বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তা ও এক বা দুটি শহর কেবল নিরাপদ।
গত মাসে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও প্রখ্যাত নারীরা তালেবানের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছেন। অনেকেই দেশটি ছাড়ার সুযোগ না পেলেও অন্তত শহরটি ছাড়তে চাইছেন।
ফরোগ মোহাম্মদি জানান, তালেবানের এই অবস্থান মানে বড় অঙ্কে অর্থ সংগ্রহ করা। আর সম্ভব হলে শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তার কথা, শহরের সব জায়গায় অর্থ ছড়িয়ে রয়েছে। তারা যদি শহরটির দখল নিতে পারে তাহলে তা অর্থের খনিতে পরিণত হতে পারে।
মেহরাবুদ্দিন নামের ব্যক্তি কাঁধে রকেট লঞ্চার নিয়ে ইনজিল জেলার কাছে রাস্তায় অবস্থান করছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি তালেবান শহরটির ১০ কিলোমিটারের কাছাকাছি চলে আসে। এরপর থেকে বেশ কয়েকবার তাকে রকেট ছুড়তে হয়েছে।
হেরাতের বিভিন্ন জেলার পাহাড়ি এলাকায় তালেবান অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদ্রোহী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
রকেট লঞ্চার সঙ্গে রাখার বিষয়ে মেহরাবুদ্দিন জানান, দিনের বেলা এলাকাটি শান্ত থাকে। কিন্তু রাতে লড়াই শুরু হয়। তিনি বলেন, তালেবান যোদ্ধাদের বাড়ি এই এলাকায়। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, তাদের বাড়িগুলো অস্ত্রে ভর্তি। হয়তো এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে নজর রাখছে।
বিদ্রোহী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, তারা তালেবানের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় পাকিস্তানি ও ইরানি যোদ্ধাদের মোকাবিলা করেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, স্থানীয় তালেবান সদস্যদের বিরুদ্ধেই মূলত তাদের লড়াই করতে হচ্ছে। এর ফলে লড়াইটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আফগানের বিরুদ্ধে আফগান।
এরপরও হেরাতের মানুষেরা বলছেন, তালেবানরা শহরের দখল নিতে চাইলে তারা তা হতে দিবেন না।
১৯৮০-এর দশকে সাবেক কমান্ডার ইসমাইল খান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি জানান, এই মাসের শুরুতে প্রদেশের ১৫টির মধ্যে ৮টি জেলার দখল নিয়েছে তালেবানরা। এরপর তিনি হেরাতে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
ইসমাইল খান জানান, তালেবানের কাছ থেকে শহর রক্ষায় আফগান বাহিনীর পাশে দাঁড়াবে হেরাতের জনগণ। যদিও সব আফগান শান্তি চায়। কিন্তু দোহায় চলমান শান্তি আলোচনা সময়ের অপচয়। কারণ, তালেবানরা নিজেদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করছে।
সাবেক এই কমান্ডার নিজের দেশ রক্ষায় জনগণকে রুখে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে তিনি এই প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করেন। তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি কয়েকশ’ পুরুষ, তরুণ ও বয়স্কদের আহ্বান জানিয়েছেন। হেরাতে তার বাড়িতে কয়েক ডজন মানুষ বাগানে অপেক্ষা করছেন, তাদের হাতে বন্দুক এবং লড়াইয়ে যোগ দিতে চান।
মোহাম্মদ ইয়াসিনি একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী। ১২ বছর বয়সে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ওই সময় কয়েক হাজার আফগানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন তিনি। তখন তার সঙ্গে ছিলেন ২৭ বছরের ইসমাইল খান।
এখন ৬০ বছরের ইয়াসিনি আবারও খানের বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তার মতে, এতে হেরাতের বীরত্বের কথা তালেবানকে মনে করিয়ে দেবে।
ইয়াসিনি বলেন, ‘তারা কখনও হেরাত দখল করতে পারবে না। কারণ, এটি মুজাহিদিনের শহর’। সূত্র: আল জাজিরা।









