আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তালেবানের প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দিচ্ছে ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান (আইএস-কে)। একের পর পর রক্তাক্ত হামলা চালাচ্ছে তারা। শনিবার শিয়া মসজিদে এক আত্মঘাতী হামলা চলায় তারা। কুন্দুজ শহরে জুমার নামাজের সময় এই হামলায় অনেক প্রাণহানি হয়েছে। এ হামলার লক্ষ্য ছিল বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেশকে পরিচালনা কঠিন করে তোলা। এর আগে আগস্টে কাবুল বিমানবন্দরে আরেকটি আত্মঘাতী হামলায় শতাধিক আফগান ও ১৩ মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে তালেবান ও আইএস-কে’র মধ্যকার শত্রুতার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
আইএস-কে কারা?
বৃহত্তর ইসলামি স্টেট গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালের শেষ দিকে। যখন ইরাক ও সিরিয়ায় লড়াইরত সুন্নি চরমপন্থীরা একটি ‘খিলাফতের’ প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় সিরিয়ার অনেক ভূখণ্ড দখল করে। পরে মার্কিন সমর্থিত যোদ্ধা, সিরিয়া ও ইরাক সরকারের অভিযানে এসব ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু ততদিনে খোরাসানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গোষ্ঠীটির অনুগত বাহিনী তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের ভূখণ্ড নিয়ে খোরাসান অঞ্চল গঠিত।
ফরাসি থিংক ট্যাংক স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের জ্যেন-লুক ম্যারেট আইএস-কে উইঘুর, উজবেক ও তালেবান দলত্যাগীসহ সাবেক জিহাদিদের একটি সংগঠন হিসেবে মনে করেন।
কুন্দুজে শুক্রবারের বোমা হামলায় আত্মঘাতী ছিল একজন উইঘুর। এই সম্প্রদায় চীনে মুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে নিপীড়িত হচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুসারে, আইএস-কে’র ৫০০ থেকে কয়েক হাজার যোদ্ধা রয়েছে উত্তর ও পূর্ব আফগানিস্তান। এর মধ্যে রাজধানী কাবুলে তালেবানের নাকের ডগায় তাদের সেল রয়েছে।
২০২০ সাল থেকে গোষ্ঠীটি একজন ‘শাহাব আল-মুজাহির’-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার আগমন আরব বিশ্ব থেকে। যদিও তার জাতীয়তা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। গুজব রয়েছে সে একজন সাবেক আল-কায়েদা কমান্ডার অথবা হাক্কানি নেটওয়ার্কের একজন সাবেক সদস্য। হাক্কানি গোষ্ঠী আফগান তালেবানের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও ভয়ানক অংশ।
হুমকির ব্যাপকতা কেমন?
২০২০ সাল পর্যন্ত তালেবানের কর্মকাণ্ডে ঢাকা ছিল আইএস-কে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ড্রোন হামলায় প্রভাব হারাচ্ছিল গোষ্ঠীটি। কিন্তু রহস্যময় নতুন নেতার আবির্ভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইনে জঙ্গিবাদ শনাক্তকারী সংস্থা এক্সট্র্যাক-এর গবেষক আবদুল সায়েদের মতে, তাদের নেতা শাহাদ শহুরে যুদ্ধ ও প্রতীকী সহিংসতায় জোর দিয়েছে। তিনি বলেন, তালেবান তাদের প্রধান টার্গেট হলেও আইএস-কে ধর্মীয় স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালের মতো পাবলিক প্লেস ইত্যাদিতেও হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য তাদের জঙ্গিবাদের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।
তালেবান ও আইএস-কে উভয়েই সুন্নি গোষ্ঠী। যদিও কাবুলে সরকার গঠনের তালেবান সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আইএস-কে শিয়াদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়।
ইরাকে মূল আইএস শিয়া সম্প্রদায়কে টার্গেট করেছিল। আফগানিস্তানেও আইএস-কে শিয়া সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হাজারাদের হুমকি দিয়েছে।
বিরোধের সূত্রপাত কোথায়?
আইএস-কে’র অনেক যোদ্ধা তালেবান বা তাদের মিত্র গোষ্ঠীর হয়ে যুদ্ধ কিংবা আল-কায়েদা সশস্ত্র বিদ্রোহে সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছে। কিন্তু এখন গোষ্ঠীটির লক্ষ্য আলাদা।
২০২১ সালে এসে তালেবান তাদের ইসলামি শরিয়াহ আইনের ব্যাখ্যায় আফগানিস্তান শাসন করতে চায়। কিন্তু আইএস-কে আরও দূরবর্তী লক্ষ্য বৈশ্বিক খিলাফত গঠন করতে চায়।
তালেবান মুখপাত্র আইএস-কে গোষ্ঠীকে ‘তাকফিরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামে যে মতবাদে বিশ্বাসীরা অন্যান্য মতবাদ ও মাজহাবে বিশ্বাসীদের ‘কাফের’ বলে আখ্যায়িত করে তাকে তাকফিরি মতবাদ বলা হয়।
দুই গোষ্ঠীর বাকবিতণ্ডায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও সত্যিকার পার্থক্য খুব কম এবং কমান্ডারের দৃষ্টিভঙ্গি ও সুযোগ অনুসারে যোদ্ধারা পক্ষ বদল করতে ওস্তাদ।
ড্রাগনফ্লাই সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স-এর বারবারা কেলেমেন বলেন, তালেবানকে যারা বেশি আধুনিক মনে করে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্তুষ্ট না এমন সদস্যদের আইএস-কে রিক্রুট করেছে সফলভাবে। তালেবান যখন কিছুটা সংস্কারকামী হিসেবে দেশ শাসন করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তখন আইএস-কে এগুলো প্রত্যাখ্যানকারী প্রধান গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এতে করে তালেবানে অসন্তুষ্ট সমর্থকদের আরও বেশি করে দলে ভেড়ানোর সুযোগ তাদের সামনে থাকবে। তালেবানের ওপর হামলা চালাতেও উৎসাহিত করবে তারা।
তালেবান কি সুবিধাজনক অবস্থানে?
মার্কিন থিংক ট্যাংক উড্রু উইলসন সেন্টারের মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ১৫ আগস্টের পর থেকে আফগান জনগণের প্রতি তালেবানের মূল বার্তা হলো তারা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা এনেছে। কিন্তু শুক্রবার কুন্দুজে পরিচালিত বোমা হামলা তাদের এই অবস্থানকে বিশালভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আফগানিস্তানের মার্কিন সমর্থিত সরকারগুলো দুই দশকে শত কোটি ডলার ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পশ্চিমা সেনাদের নিয়েও তালেবান বা আইএস-কে পরাজিত করতে পারেনি। এখন তালেবানকে বাইরের সহযোগিতা ছাড়াই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করতে হবে। মার্কিন সেনাবাহিনীর মতো কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি চালানোর মতো সরঞ্জামও তাদের নেই।
যদিও শত্রু সম্পর্কে তাদের জানাশোনা ভালো। গত সপ্তাহেই তারা কাবুলে একটি আইএস-কে সেল গুড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। শহরের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদে হামলার পরই এই ঘোষণা দেয় তালেবান। আইএস-কে’র কৌশল সম্পর্কেও তারা ভালো জানে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌফান সেন্টারের এক প্রতিবেদনে যেমনটি বলা হয়েছে, আইএস-কে’র সঙ্গে লড়াইয়ে তালেবান হাক্কানি নেটওয়ার্ক, আল-কায়েদা ও বেসরকারি সহিংস শ্রমশক্তি, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও লজিস্টিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।







