উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় চিন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা শতাধিক বাড়ি ও দুটি গির্জা জ্বালিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় নাগরিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলায় ২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
শুরুতে সামরিক বাহিনী থান্তলাংয়ে প্রবেশের আগে সেখানে ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণ করে। শুক্রবার এক সেনা সদস্যের ওপর চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্সের হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়া বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি হলো এই চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে সেনাবাহিনী, সরঞ্জাম ও সরবরাহ পাঠাচ্ছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। সামরিক শাসন-বিরোধী বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বড় ধরনের অভিযান চালানো হতে পারে বলে সতর্ক করে আসছিলেন বিশ্লেষকরা।
কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল মানবাধিকার সংগঠনগুলো। জুনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে ভোট দেয় কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ এখনও নেয়নি। মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় দুই অস্ত্র সরবরাহকারী চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। মিয়ানমারবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতা তারা সব সময় করে বেইজিং ও মস্কো।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর জাতিসংঘ পরিচালক লুইস চারবোনিয়াউ বলেন, অনেক আগে যা করা উচিত ছিল সেই উদ্যোগ নিতে নিরাপত্তা পরিষদের এখনও সময় আছে। আইনিভাবে মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া উচিত।
এইচআরডব্লিউ জানায়, তারা স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনায় থান্তলাং শহরে একাধিক অগ্নিকাণ্ড শনাক্ত করা গেছে। এতে শতাধিক বাড়ি-ভবন পুড়িয়ে দেওয়ার যে দাবি করার হচ্ছে তার সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। তবে মেঘের কারণে নির্দিষ্টভাবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি-ভবনের সংখ্যা জানা যায়নি।
দাতব্য সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন শুক্রবার বলেছে, তাদের একটি কার্যালয়সহ শতাধিক ভবন আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। দশ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগ সাম্প্রতিক সংঘাতের আগেই পালিয়েছেন।
চিন রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্মালম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। মিয়ানমারের সামরিক শাসনামলে নিপীড়িত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর একটি রাজ্যে বাস করে। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে বৃহত্তম পকেটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে এই রাজ্য। ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর হাজারো মানুষ এলাকা ছেড়ে ভারতে পালিয়েছে।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জনগণের বিরুদ্ধে জান্তা সরকারের সহিংসতায় তারা গভীর উদ্বিগ্ন। তবে জান্তার এক মুখপাত্র ঝাও মিন তুন দাবি করেছেন, মিলিশিয়া যোদ্ধারা চারটি বাড়ি পুড়িয়েছে।
২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পরও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়েছে। ওই অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত ও সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কয়েকটি সংগঠন সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বান জানিয়েছে, ২০১৭ সালে যে ভুল হয়েছে চিন রাজ্যে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় জাতিসংঘ সামরিক অভিযানের সতর্কতার পরও তা বন্ধে কোনও উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়।
‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা আমাদের ব্যর্থ করেছে। আমরা আশা করি চিন রাজ্যের জনগণকে হতাশায় ফেলবে না জাতিসংঘ।’ বলেছে গোষ্ঠীটি।









