নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ ও সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলন সোমবার রূপ নেয় সহিংসতায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ছিল এই বিস্ফোরণের প্রধান কারণ।
সরকার দুই ডজনের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞা দিলে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নামে। সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ১৯ জন। আহত হন চার শতাধিক। সেদিন রাতেই জনচাপের মুখে অলি সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞাই নয়, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা এই আন্দোলনকে এত দ্রুত সহিংসতায় ঠেলে দিয়েছে। মঙ্গলবার বিক্ষোভ চলেছে। এ সময় সংসদ ভবন, মন্ত্রীদের বাড়ি এমনকি অলি নিজ বাসভবনেও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।
জেন-জি’র নেতৃত্বে আন্দোলন
এই আন্দোলন মূলত তরুণ প্রজন্মের, বিশেষ করে জেনারেশন জি-এর। আন্দোলনের অগ্রভাগে রয়েছেন কাঠমান্ডুর তরুণ মেয়র ও র্যাপার বালেন শাহ (৩৫) এবং রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা রবি লামিছানে (৪৯), যিনি গত বছর অল্প সময়ের জন্য উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
নেপাল ইনস্টিটিউট ফর পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা সান্তোষ শর্মা পাওডেল এটি তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। বয়স্করা কেবল সমর্থন দিচ্ছেন।
পরিবর্তনের প্রত্যাশা
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দেশব্যাপী কারফিউ জারি আছে এবং সেনাবাহিনী সহিংসতা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত যে কাউকে শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীর চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যেখানে সেনারা চলাচলকারী যানবাহনের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করছে।
তবুও কিছু তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা মুখে মাস্ক পরে এবং হাতে ময়লার ব্যাগ নিয়ে বিক্ষোভের কারণে হওয়া ক্ষতি পরিষ্কার করছে।
তাদের মধ্যে একজন ১৪ বছর বয়সী কসাং লামা। বিক্ষোভে অংশ না নিলেও তিনি আশা করেন যে এটি নেপালে পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, এই দুর্নীতির বিষয়টি নেপালে অনেক, অনেক দিন ধরে চলে আসছে এবং আমি মনে করি এখন দেশের পরিবর্তনের সময় এসেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি সত্যিই আশা করি এটি আমাদের দেশের জন্য কিছু ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।
পরিবর্তনের আরেক সমর্থক ২৪ বছর বয়সী পারাশ প্রতাপ হামাল। তিনি মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। হামাল জানান, তারা অনেক দূষণ ঘটিয়েছিলেন বলে তিনি এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন যে, নেপালের স্বাধীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহকে এমন একজন হিসেবে উল্লেখ করেন যিনি দেশের জন্য একজন ভালো নেতা হতে পারেন।
পূর্ব নেপালের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী রাকেশ নিরালা বলেন, এই বিপ্লবের পর মানুষ এখন আশাবাদী। ভালো শাসনের আশা আছে... আমরা মনে করি এটি নেতাদের জন্য একটি শিক্ষা ছিল যাতে তারা নিজেদের আরও উন্নত করতে পারে এবং দেশ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পেতে পারে।
যদিও তারা পরিবর্তনের আশাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কিছু নেপালি বলেছেন যে, বিক্ষোভের তীব্রতা বোঝাতে যে পরিমাণ সহিংসতা ও ভাঙচুর হয়েছে তা তাদের অবাক করেছে।
নিরালা বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এমনটা হওয়া উচিত ছিল না।
লিতপুর শহরের একজন উদ্যোক্তা প্রভাত পাউডেল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের মতো সরকারি ভবন পুড়িয়ে দেওয়া আমাকে স্তম্ভিত করেছে।
‘নেপালে কোনও ভবিষ্যৎ নেই’
নেপাল ইনস্টিটিউট ফর পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা সান্তোষ শর্মা পাওডেল মনে করেন, ২০০৬ সালে রাজতন্ত্র পতনের পর এবং ২০১৫ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় নাগরিকদের বড় প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, মানুষের ধারণা, দুর্নীতি বেড়েছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা পশ্চিমে চলে গেছে, আর যাদের নেই তারা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছে। ফলে তরুণদের মনে হয়েছে, নেপালে কোনও ভবিষ্যৎ নেই।
পাওডেল আরও বলেন, যুবকেরা যখন রাজনৈতিক নেতাদের ওপর আক্রমণ চালায়, তখন বোঝা যায় তাদের ক্ষোভ কতটা তীব্র। প্রতিষ্ঠানগুলো পোড়ানো দেখাচ্ছে, তারা মনে করছে এসব প্রতিষ্ঠান আর তাদের জন্য কিছুই করছে না। সংসদ, আদালত, রাজনৈতিক দল কিছুই আর প্রয়োজন নেই।’’
সামনে কী?
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু কে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন বা এরপর কী হবে তা স্পষ্ট নয়, কারণ আপাতদৃষ্টিতে কেউ দায়িত্বে নেই। ওলির পদত্যাগে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সাময়িকভাবে কমলেও নেপালের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তরুণদের ক্রোধ ও হতাশা প্রশমিত করতে ব্যর্থ হলে দেশটি আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেপালের সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখিয়ে দিলো, পুরো একটি প্রজন্ম তাদের দেশকে আর বিশ্বাস করে না। এ অবিশ্বাস দূর না হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই টলে উঠতে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এরপর কী হবে? পাওডেল বলছেন, ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পুরোনো আকারে ফিরবে, নাকি নতুন কোনও রূপে আসবে, তা এখনও বলা যাচ্ছে না। সমাধান আন্দোলনের নেতাদের মেনে নিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীও বুঝতে শুরু করেছে, সমাধানের জন্য পিছু হটে আলোচনায় আসতে হবে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জেন জি বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমরা বিশ্বাস করি যে নেপালের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে, পুরোপুরি স্বাধীন হতে হবে এবং যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হতে হবে।
তারা আরও বলেছেন, আমরা একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল সরকার চাই, যা জনগণের স্বার্থে কাজ করবে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা রাজনৈতিক অভিজাতদের সুবিধার জন্য নয়।
৪০ বছর বয়সী কাঠমান্ডুর সমাজকর্মী তারু কার্কির কথায়ও এই মনোভাবের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে এবং নিরীহ তরুণ-তরুণীরা মারা গেছে।
তিনি আরও বলেছেন, এখন দেশে শান্তি দরকার এবং যে দুর্নীতির কারণে এত মানুষ হতাশ হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে, তার অবসান হওয়া উচিত। যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় কি একই ধারা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে নেপালের ঘটনাকে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসা পরিবারের পতন এবং ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নেপালেও একই ধারা চলছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পাওডেল মনে করেন, বাইরের হস্তক্ষেপের প্রমাণ নেই। মাওবাদী বিপ্লবের সময় যেমন বহিরাগত প্রভাব ছিল, এবার তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। এটি সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আন্দোলনকারীরাই এর কৃতিত্ব পাওয়ার যোগ্য।
সূত্র: স্ক্রল, বিবিসি









