গত চার দশক ধরে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে ইস্পাত তৈরির কারখানা চালাচ্ছেন ৬৫ বছর বয়সী পঙ্কজ চাদা। তার উৎপাদিত পণ্যের প্রধান বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। কিন্তু সম্প্রতি এই দুই দেশেই আমদানিতে চড়া শুল্ক আরোপ করায় ব্যবসা নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তিনি। চাদা জানালেন, শুল্ক কার্যকরের পর দুই দেশেই তার ব্যবসার পরিমাণ অর্ধেক হয়ে গেছে।
কেবল পঙ্কজ চাদাই নন, ভারতের হীরা কাটা, চিংড়ি চাষ, গালিচা ও অটোমোবাইল খাতের হাজারো ব্যবসায়ী এখন মেক্সিকোর নতুন শুল্কনীতির কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে। একে ভারতের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
গত আগস্টে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় শাস্তি হিসেবে পরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক যোগ করা হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১ জানুয়ারি থেকে মেক্সিকোও ভারতসহ যেসব দেশের সঙ্গে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নেই, সেসব দেশের ১ হাজার ৪০০ পণ্যের ওপর ৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেক্সিকো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রোষানল থেকে বাঁচতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। চীন বা ভারতের মতো দেশগুলো মেক্সিকোকে ব্যবহার করে যাতে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে মেক্সিকোকে চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
পঙ্কজ চাদা বলেন, মার্কিন শুল্ক তবু মেনে নেওয়া যায় কারণ সেটি আমাদের প্রতিযোগীদের ওপরও ছিল। কিন্তু মেক্সিকোর শুল্ক শুধু আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে যাদের সঙ্গে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই। এতে আমরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছি।
২০২৪ সালে ভারত মেক্সিকোতে ৫৬০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইস্পাত খাত, যেখানে শুল্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। এ ছাড়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর ৩৫ শতাংশ এবং পোশাক ও সিরামিক পণ্যে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। গত বছর ভারত মেক্সিকোতে প্রায় ৯৪ কোটি ডলারের যাত্রীবাহী গাড়ি এবং ৩৯ কোটি ডলারের মোটরসাইকেল রফতানি করেছিল।
অটোমোবাইল কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার (এসিএমএ) মহাপরিচালক ভিনি মেহতা জানান, মেক্সিকোতে রফতানি করা অনেক যন্ত্রাংশ মূলত যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিযোগ্য গাড়িতে ব্যবহৃত হতো। নতুন শুল্কের ফলে এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রফতানিকারকদের এই সংকট কাটাতে ১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত কেন্দ্রীয় বাজেটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) কারখানাগুলোকে ছাড়কৃত শুল্কে দেশের বাজারে পণ্য বিক্রির অনুমতি দিয়েছে ভারত সরকার। এ ছাড়া অটোমোবাইল খাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে জিএসটি ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, ভারত এখন নির্দিষ্ট দু-একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি বাজার বহুমুখীকরণের দিকে নজর দেবে। অন্যদিকে ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস (এফআইইও) সরকারকে মেক্সিকোর সঙ্গে দ্রুত একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছে।








