বিজয়া দশমীর দিন শূন্য মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা চোখে চার বছরের এক শিশুর বিস্ময়, ‘মা’ যে চলে গেছেন। তার কাছে দুর্গাপূজার অর্থ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নতুন পোশাক, বাজির শব্দ, সুস্বাদু খাবার আর চার দিনের অবাধ স্বাধীনতা। আর দিনশেষে সেই আনন্দের ইতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অধিকাংশ বাঙালির কাছে দুর্গাপূজার ক্যানভাসটা ঠিক এমনই; সর্বজনীন, যেখানে আনন্দ ও শিল্পের মিলন ঘটে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঐতিহ্য, ধর্মীয় আচার ও আধুনিকতার সংঘাতের মধ্য দিয়ে বাঙালির এই প্রাণের উৎসব এক নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) পূজা আয়োজকদের প্রথাগত রীতিতে ফেরার আহ্বান জানিয়ে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে আমিষ খাবার বিক্রি ও গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানিয়েছে। এরপরই বাবা বাগেশ্বর নামে পরিচিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী পূজার সময় আমিষভোজীদের ‘পাষণ্ড’ বলে তোপ দাগেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঐতিহ্য বিকৃত করা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো থিম ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশিকা জারি করলে বিতর্ক চূড়ান্ত রূপ নেয়। যেখানে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, সেখানে এই ধরনের নির্দেশিকা বাঙালিদের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে।
দুর্গাপ্রতিমার গঠন ও শৈল্পিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বরানগরের বিজেপি বিধায়ক ও সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার পূজার মূল উদ্যোক্তা সজল ঘোষ। তিনি বলেন, যে প্রতিমাকে আমরা ভক্তিভরে পূজা করি, তা কখনোই পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় হতে পারে না এবং শাস্ত্রীয় নির্দেশিকা মেনে চলা উচিত। আমরা দেখেছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদলে কিংবা দশ হাতে ১০টি সরকারি প্রকল্পের নাম বা ১০টি শিশুকে বসিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে, যা দেবীর প্রথাগত রূপকে বিকৃত করে।
তবে তিনি আরও বলেন, প্রতিমার পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। মানুষ যত খুশি আমিষ খেতে পারেন, তবে তা মণ্ডপের ভেতরে নয়, বাইরে।
অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করে আরএসএস প্রচারক জিষ্ণু বসু বলেন, মহাষষ্ঠীর দিনে বাঙালি হিন্দুরা দেবীকে আবাহন করেন। হাজার হাজার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এর সঙ্গে জড়িত। বামপন্থি বা শিল্পীরা কি অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবেন?
বিজেপি মুখপাত্র রাজর্ষি লাহিড়ী বলেন, বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা নেতাজির মতো বিপ্লবীরা দুর্গাকে ‘ভারত জননী’ রূপে পূজা করেছিলেন, আধুনিক প্রজন্মের মতো মদ্যপান বা খাবার বাছাইয়ের সংস্কৃতি বাঙালি ঐতিহ্য নয়।
তবে শিল্পীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। চিত্রশিল্পী সনাতন দিন্দা ১৯৯৮ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অস্ত্রহীন দুর্গার রূপ তৈরি করেছিলেন। বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাঙালি গানে দেবীকে ঘরের মেয়ে উমা হিসেবে ধরা হয়। মেয়েকে কীভাবে সাজানো হবে, তা কি কোথাও নির্দিষ্ট করে লেখা আছে? আমরা ঐতিহ্যবাহী ঘটপূজা বদলাচ্ছি না, মূল প্রতিমাটি একটি শিল্পকর্ম এবং শিল্পীর তা কল্পনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
অন্যতম প্রখ্যাত শিল্পী ভবতোষ সুতার বলেন, বাঙালির দুর্গাপূজা কোনও বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করে না। রাজনন্দিনী দুর্গা রাজকীয় আসন ছেড়ে রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যান কেবল এই বাংলাতেই।
শিল্প ইতিহাসবিদ ঐন্দ্রিলা মাইতি সুরার মতে, ধর্মীয় শিল্পের ইতিহাসে শিল্পীরা সব সময়ই স্বাধীনতা নিয়েছেন; এখন উল্টো তাদের ওপর নানা নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দুর্গাপূজার এই জাঁকজমক ও প্রদর্শনপ্রিয়তা নতুন নয়। আমলা ও সাবেক রাজ্যসভা সাংসদ জহর সরকার বলেন, দুর্গাপূজায় কখনোই গোঁড়ামি ছিল না। গোঁড়ামি আমরা কালীপূজার জন্য রাখি। দুর্গা মানে ঘরের মেয়ের আগমন।
ইতিহাসবিদ ও লেখিকা সুদেষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ১৬৮০ সালে তাহেরপুরের রাজা উদয়নারায়ণ এবং সপ্তদশ শতকে কংসনারায়ণ লাখ টাকা খরচ করে আড়ম্বরপূর্ণ পূজার সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেবের রাজকীয় পূজা কিংবা জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ-এর সোনার গহনায় মোড়ানো প্রতিমা; সবই ছিল বুনিয়াদি পরিবারের প্রাচুর্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। পরবর্তীতে বিশ শতকের শুরুতে এই উৎসব গণমানুষের ‘সর্বজনীন’ উৎসবে রূপান্তরিত হয়, যেখানে সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতারাও যুক্ত ছিলেন।
শিল্প ইতিহাসবিদ তপতী গুহ ঠাকুরতা বলেন, মণ্ডপ ও রাস্তার আর্ট কোনও বিকৃতি নয়, বরং এটি শিল্পের উদযাপন।
সাধারণ মানুষের কাছে এই বিতর্কের প্রভাব কেমন? স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা রণদীপ নস্কর বলেন, ‘আমার কাছে পূজা মানে কাজ থেকে ছুটি। নির্দেশ দিয়ে সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা সমস্যাজনক।’
দূরপ্রবাসে থাকা সংবাদকর্মী রিতবান মিশ্র জানান, ‘পূজা কেবল ধর্ম নয়; এটি গান, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া ও মানুষের এক হয়ে ওঠার উৎসব।’
সাংবাদিক ঈশানী ধর বলেন, ‘পূজার দিনগুলোতে আমাদের মুসলিম গৃহপরিচারিকা চার দিনের ছুটি নেয়, বাচ্চাদের জামা কেনে। উৎসবের এই অন্তর্ভুক্তিই আমাদের আসল সংস্কৃতি।’
সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও পূজা আয়োজক প্রিয়ঙ্কর দাস স্পষ্ট জানান, বিজি আর কর কাণ্ড বা যেকোনও সরকারি-বেসরকারি নির্দেশিকা বাঙালি নিজের পূজায় চাপিয়ে দিতে দেবে না। লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য মনে করেন, এই বিতর্ক পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাঙালি উৎসবের উদার সংস্কৃতিকে পাল্টানোর চেষ্টা।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শৈশবের সেই শিশুটি, যে আজ ত্রিশের কোঠায়, প্রবাসে বসে কেবলই ভাবছে, তার শৈশবের সেই ‘সেরা দিনগুলো’ কি তবে চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে?
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
যুক্তরাষ্ট্র কেন নিঃসঙ্গ শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, জানালেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যে ফুলনকে সিনেমা বানিয়েছিল ‘দস্যু সুন্দরী’, গ্রামের মানুষ আজও তাকে ‘দেবী’ বলেন কেন?