তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম সেনাদের একাংশের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকে ‘ব্যর্থ’ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশটির সেনাদের একাংশ এ অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অভ্যুত্থান চেষ্টা ও তা দমনে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন দেড় সহস্রাধিক এবং গ্রেফতার হয়েছে আরও তিন হাজার সেনা সদস্যকে।আটক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন।
শুক্রবার মধ্যরাতে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের ডানপন্থী সরকার উচ্ছেদের দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনীর একাংশ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে’ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’দেশ চালাবে এবং কারফিউ ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে। কারফিউর বিরোধিতা করে এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
তুরস্কের সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ২৬৫ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যুত্থানের চেষ্টাকারী ১০৪ জন। বাকিরা পুলিশ ও বেসামরিক লোকজন। এর আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন নিহতের সংখ্যা ১৬২ জন। তার আগে ভারপ্রাপ্ত সেনা প্রধান জানান, নিহতের সংখ্যা ১৯৪ জন। ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, নিহদের মধ্যে ৪১ জন পুলিশ সদস্য, দুইজন সেনাসদস্য, ৪৭ জন বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। নিহত বাকি ১০৪ জনকে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারী বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম জানিয়েছেন, অভ্যুত্থানের চেষ্টায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার দাবি করা হলেও এখনও পরিষ্কার নয় এর পেছনে কারা রয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ও সমর্থিত ইসলামি সংস্কারক নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করেছেন। তবে বিষয়টিও এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। এক বিবৃতিতে গুলেন এই ক্যু প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে কোনওভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত বিদ্রোহীদের হামলা চালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। আঙ্কারা, ইস্তানবুল এবং দেশটির আরও কিছু স্থানে রাতভর গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। তবে শনিবার দুপুরের পরই ইস্তানবুলে বসফোরাস সেতুতে বেশ কিছু সেনা আত্মসমর্পণ করেছেন। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া অভ্যুত্থানচেষ্টার একপর্যায়ে শনিবার তারা আত্মসমর্পণ করে। এ সময় ক্ষমতাসীন সরকারের সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা যায়।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মারমারিস থেকে ইস্তাম্বুলে ফিরতেই তার সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। এরদোয়ান এক ভাষণে এই ক্যু প্রচেষ্টাকে দেশের ওপর ‘জঘন্য’ আক্রমণ বলে উল্লেখ করেন। অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সমাপ্তি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
এর আগে শুক্রবার অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের পাঠানো একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অভ্যুত্থানপন্থী সেনা অংশটি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে। ‘শান্তি পরিষদ’ নামের ওই অভ্যুত্থানপন্থী বাহিনী জনগণকে বাইরে বের না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তখন জানায়, তুরস্কের বড় বড় শহরগুলো এখনও গুলির শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠেছে।
তবে মিডিয়ার কাছে পাঠানো বিবৃতিতে তুরস্কের সেনাবাহিনীর সরকারপন্থী অংশ দাবি করে, গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা ‘পুরোপুরিভাবে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে’। সেই গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা যেখানে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় থাকবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার রাতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা এখনও বেশ কিছু সামরিক হেলিকপ্টার দখল করে রেখেছে। সেনা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকারীদের নিয়ন্ত্রণাধীন উড়ন্ত বিমানগুলোকে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে বিমান হামলায় অংশ নিয়েছে এফ-১৬ বিমান। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান, এএফপি।
/এএ/








