শান্তিতে সম্ভাব্য নোবেলজয়ী হিসেবে এবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তালিকায় পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠনগুলোর জোট ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার উইপনসের’ (আইসিএএন) নাম ছিল না। তবে চমক তৈরি করে পুরস্কার জিতে নিয়েছে সংগঠনটি। পুরস্কার জয়ের খবর পাওয়ার পর ফেসবুকে একটি বিবৃতি দিয়েছে আইসিএএন। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপ প্রচারণায় অংশ নেওয়া লাখ লাখ কর্মী ও দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চারদের প্রতি পুরস্কারটি উৎসর্গ করেছে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী এই জোট সংগঠনটি।
জেনে নেওয়া যাক নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সংগঠনটির পরিচয়, কার্যক্রম ও কাজের ক্ষেত্র:
যেভাবে প্রতিষ্ঠা
বিশ্বজুড়ে আইসিএএন প্রতিষ্ঠা করতে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফিনল্যান্ডের হেলসিনকিতে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে নোবেল পুরস্কারজয়ী আন্তর্জাতিক পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী সংগঠন ‘ইন্টান্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার্স’। ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আইসিএএন-এর যাত্রা শুরু হয়। ক্যাম্পেইনের জন্য সেখানে তহবিল সংগহ করা হয়। একই বছরের ৩০ এপ্রিল পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী চুক্তি ‘ট্রিটি অন দ্য নন-প্রলিফারেশন অব নিউক্লিয়ার উইপনস’ নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকের মধ্য দিয়ে ভিয়েনায় সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে ১০১ দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তৃণমূল পর্যায়ের এ সংগঠনটি। প্রতিষ্ঠানটির সদর দফতর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।
আইসিএএন’র লক্ষ্য
আইসিএএন-এর ওয়েবসাইটে সংগঠনটির লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, আইসিএএন চায় পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা নিরস্ত্রীকরণের বিতর্কের প্রাধান্যে নিয়ে আসা, এসব অস্ত্রের একক ধ্বংসাত্মক সক্ষমতার দিকে মনোযোগ আকর্ষণে কাজ করবে সংগঠনটি। একইসঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে আসা, পারমাণবিক অস্ত্রের নির্বিচার টার্গেট নিয়ে কথা বলা, চিকিৎসা ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনার ওপর পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব শিথিল করা ও বিস্ফোরণের আশেপাশের এলাকায় তেজষ্ক্রিয়তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতেও সংগঠনটি কাজ করবে। স্থলমাইনবিরোধী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনসের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আইসিএএন-এর প্রতিষ্ঠাতারা।
আইসিএএন’র পাশে যারা রয়েছেন
শান্তিতে নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটু, দালাইলামা, জোডি উইলয়াম; সঙ্গীতশিল্পী হার্বি হ্যানকক, ক্রিকেটার ইয়ান চ্যাপেল, অভিনেতা মার্টিন শীন ও মাইকেল ডগলাস ও চিত্রশিল্পী ইয়োকো অনোর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সমর্থন রয়েছে আইসিএএন-এর প্রতি। বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে দৃঢ় অঙ্গীকার ও সৃজনশীলতার জন্য ২০১২ সালের নভেম্বরে আইসিএএন এবং এর অংশীদারদের প্রশংসা করেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন। আইসিএএন-এর গ্লোবাল ‘ডে অব অ্যাকশনে’র প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি ভিডিও বার্তাও দিয়েছিলেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য
আইসিএএন হলো বিশ্বের ১০১টি দেশের ৪৬৮টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী জোট। সংগঠনটি পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির (ট্রিটি অন দ্য প্রহিবিশন অব নিউক্লিয়ার উইপনস) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য প্রচারণা চালায়। মূলত আইসিএএন-এর প্রচেষ্টাতেই চুক্তিটি করা হয়েছিল।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ২০১৭ সালের ৭ জুলাই। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চুক্তিটি তুলে ধরা হয়। এরপর দুই দফা আলোচনার পর চুক্তিটির বিষয়ে জাতিসংঘে ভোট নেওয়া হয়। এতে ১২২টি দেশ চুক্তির পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস আর অনুপস্থিত ছিল সিঙ্গাপুর। ভোট দেয়নি ৬৯টি দেশ। ভোট না দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রধর সব দেশ ও নেদারল্যান্ডস ছাড়া ন্যাটোর সব সদস্য রাষ্ট্র। চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে ন্যূনতম ৫০টি রাষ্ট্রের স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর প্রয়োজন হবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই চুক্তিতে কিছুই হবে না। বরং এতে করে পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়বে।
যে কারণে শান্তিতে নোবেল
শুক্রবার আইসিএএনকে পুরস্কারজয়ী ঘোষণা করতে গিয়ে নোবেল কমিটি জানায়, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ এবং এ ধরনের অস্ত্রবিলোপে একটি চুক্তির জন্য আইসিএনএ'র প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিক্রিয়া
পুরস্কার জয়ের পর ফেসবুকে একটি বিবৃতি দিয়েছে আইসিএএন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আণবিক যুগ শুরুর পর থেকে যারা পারমাণবিক অস্ত্র রোধে সোচ্চার এবং বিশ্ব থেকে এ ধরনের অস্ত্র বিলোপের পক্ষে যারা সোচ্চার, সেই লাখ লাখ ক্যাম্পেইনার ও বিশ্বের উদ্বেগীদের পুরস্কারটি উৎসর্গ করা হচ্ছে।’








