লেবার পার্টির ভেতর থেকে তীব্র ও ক্রমাগত চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার (২২ জুন) তিনি এই ঘোষণা দেন। নীতি পরিবর্তনের নানামুখী সিদ্ধান্ত এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা হারিয়ে প্রায় দুই বছরের মাথায় তার এই প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটছে।
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে কিয়ার স্টারমার বলেন, আমি যে সিদ্ধান্তই নিয়েছি, তা আমার ভালোবাসার দেশকে সবার ওপরে রাখার জন্যই নিয়েছি। আর সেই কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করছি।
তিনি জানান, আগামী জুলাই মাস থেকে লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যাবেন এবং পরবর্তী উত্তরসূরি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকবেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
স্টারমার বলেন, জুলাই মাসে এই মধ্য-বামপন্থি দলটির নতুন নেতা খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্ট অধিবেশন বসার আগেই নতুন নেতা চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে স্টারমারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রবীণ রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নহাম বৃহস্পতিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ নির্বাচনে জয়লাভের পর সোমবার পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। এই জয়ের মাধ্যমে তার পার্লামেন্টে ফেরার পথ যেমন সুগম হলো, তেমনি দলের শীর্ষ পদের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার পথও পরিষ্কার হলো।
স্টারমার বলেন, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাব এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি যেন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করব।
গত সপ্তাহেও স্টারমার তার পদে টিকে থাকার এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনমনীয় ছিলেন। বেশ কিছু কেলেঙ্কারি এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক পদত্যাগের পর তার ও লেবার পার্টির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হলেও তিনি গত কয়েক মাস ধরে নিজের অবস্থানে অবিচল ছিলেন। তবে স্টারমারের এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে গত এক দশকের মধ্যে ব্রিটেন এবার তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।
আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছিল এবং যার পর থেকেই দেশটিতে নজিরবিহীনভাবে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। এর ঠিক আগের দিনই স্টারমারের এই বহুল প্রত্যাশিত পদত্যাগের ঘোষণাটি এলো। ২০২৪ সালে দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টিকে একটি নির্বাচনে জয়ী দলে রূপান্তর করার কৃতিত্ব স্টারমারকে দেওয়া হয়। তবে ভাতা কর্তন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মতো বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তার মেয়াদকাল ব্যাহত হয়।
এর আগে গত মার্চ মাসে প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের পরিচিত সহযোগী পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রায় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মুখে পড়েছিলেন।
পাশাপাশি অতি-ডানপন্থি এবং অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে-এর দ্রুত উত্থান ঠেকাতেও হিমশিম খেয়েছেন স্টারমার। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে এই দলটির কাছে লেবার পার্টি পরাজিত হলে স্টারমারের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
পদত্যাগের ভাষণে স্টারমার আরও বলেন, আমি আমার উত্তরসূরিকে পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাব। আমি জানি, দুই বছর আগে আমি যে অবস্থায় ব্রিটেনকে পেয়েছিলাম, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ন্যায্য একটি ব্রিটেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে যাচ্ছেন।









