ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপসহ সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সম্ভাবনার আইনি পথ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যাংক পুনর্গঠন ও সংকটাপন্ন ব্যাংক সচল রাখতে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এ যুক্ত করা বহুল বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিল করা হচ্ছে। ফলে রেজুলেশন বা একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের আগের মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী বিশেষ শর্ত পূরণ করে সেই ব্যাংকের মালিকানা, সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আর থাকছে না।
সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘ব্যাংক রেজুলেশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে এটি চূড়ান্ত করা হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ব্যাংক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারণ, ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার পর থেকেই ব্যাংকপাড়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— যে মালিক বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ব্যাংক সংকটে পড়েছে, তারা যদি পরবর্তীকালে অর্থ ফেরত ও নতুন মূলধন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে কি আবার সেই ব্যাংকের মালিক হতে পারবে? বিশেষ করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তে সেই সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হতে যাচ্ছে।
যে ধারাটি নিয়ে এত বিতর্ক
ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংকটের পর দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য ২০২৫ সালে ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। পরে সেটি সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’ করা হয়।
আইনটি প্রণয়নের সময় নতুন করে যুক্ত করা হয় ১৮(ক) ধারা। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত রেজুলেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি বাজারভিত্তিক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ কোনো ব্যাংককে রেজুলেশনের আওতায় নেওয়ার পরও যদি পুরোনো বা নতুন কোনো উপযুক্ত বিনিয়োগকারী ব্যাংকটির দায়-দায়িত্ব গ্রহণ, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা দেখাতে পারে, তাহলে তাকে ব্যাংকটির শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
শর্তও ছিল কঠিন। আবেদনকারীকে সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া আর্থিক সহায়তা ফেরত দিতে হবে, নতুন মূলধন দিতে হবে, মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে, আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা দিতে হবে। সরকারের যুক্তি ছিল, এতে ব্যাংক পুনরুদ্ধারের খরচ কমবে, আমানতকারীরা দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সরকারের ওপর আর্থিক চাপও কমবে।
কিন্তু আইনটি পাস হওয়ার পরই প্রশ্ন ওঠে— ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরোনো মালিকই যদি টাকা জোগাড় করে আবার মালিকানায় ফিরে আসেন, তাহলে ব্যাংক খাত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য কোথায়?
এস আলমকে ঘিরেই মূল আশঙ্কা
১৮(ক) ধারা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল এস আলম গ্রুপের নাম। কারণ, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক— একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর ব্যাংকটি ছিল এক্সিম ব্যাংক, যা নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
গত সরকারের সময়ে এসব ব্যাংকে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, ঋণ অনিয়ম এবং দুর্বল সুশাসনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ১৮(ক) ধারা কার্যকর থাকলে প্রশ্ন দেখা দেয়— এসব ব্যাংকের আগের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী কি কোনো এক পর্যায়ে আবার মালিকানায় ফিরতে পারে?
আইনের ভাষায় সুযোগটি শুধু এস আলমের জন্য ছিল না। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে এস আলম গ্রুপের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন। এ কারণেই ধারাটি ব্যাংক খাতে ‘এস আলমের ফেরার পথ’ হিসেবে আলোচিত হতে থাকে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক ক্ষত কতটা গভীর
পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থার চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ ফেরত আসছিল না। খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ছিল মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট।
এই অবস্থায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যাংকগুলো সচল রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পথে যেতে হয়েছে। নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মধ্যে শেয়ার হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় যে গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলো এত বড় সংকটে পড়েছে, তাদেরই আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকলে তা আমানতকারী ও সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা দেবে— এই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ
১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ শুধু অর্থনীতিবিদ বা ব্যাংকারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদও এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
গত ৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধিদল ধারাটি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানায়। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, কোনও ব্যাংক সংকটে পড়ার পেছনে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে, তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি হলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দুর্বল হতে পারে। সম্পাদক পরিষদ তখন আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দুর্বল ব্যাংকের কার্যকর পুনর্গঠনের ওপর জোর দেয়।
অর্থনীতিবিদদের বড় প্রশ্ন: টাকার উৎস কোথায়?
১৮(ক) ধারার পক্ষে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি ছিল—পুরোনো মালিকরা যদি নিজেদের অর্থ দিয়ে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করে এবং নতুন মূলধন বিনিয়োগ করে ব্যাংককে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সরকারের অর্থের চাপ কমবে। কিন্তু এর বিপরীতে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন ছিল, এত বিপুল অর্থ তারা কোথা থেকে আনবে? যদি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ দিয়ে আবার ব্যাংকের মালিকানা নেওয়া হয়, তাহলে সংকটের মূল কারণ তো দূর হবে না। বরং একটি ব্যাংকের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য ব্যাংকও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, যে ব্যবস্থাপনা বা মালিকানার সময় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে, তাদের হাতে আবার একই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গেলে আগের সমস্যাগুলো ফিরে আসবে না, এর নিশ্চয়তা কী?
সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এতে ব্যাংক খাতে এক ধরনের ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বড় ধরনের অনিয়মের পরও শেষ পর্যন্ত অর্থের ব্যবস্থা করে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে— এমন একটি বার্তা তৈরি হতে পারে।
সরকারের অবস্থানও ছিল বাস্তবতার ভিত্তিতে
তবে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করার সময় সরকারের যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ব্যাংক খাতে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়েছে। সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে আরও অর্থ লাগতে পারে। ফলে এমন কোনো বিনিয়োগকারী যদি পাওয়া যায়, যে নিজের অর্থ দিয়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে, আমানতকারীদের দায় পরিশোধ করবে এবং ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করবে, তাহলে রাষ্ট্রের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া সব শেয়ারধারী সমানভাবে দায়ী নন— ক্ষুদ্র শেয়ারধারীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বাজারভিত্তিক পুনর্গঠনের ধারণা বাস্তবে প্রয়োগের আগেই ১৮(ক) ধারা বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্কের জন্ম দেয়।
কেন এখন ধারা বাতিল করা হচ্ছে
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ১৮(ক) ধারায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। অর্থাৎ যে বিকল্প ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছিল, সেটি বাস্তবে কার্যকর হওয়ার মতো কোনো আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। ফলে সরকার মনে করছে, ধারাটি আইনে রেখে দেওয়ার আর প্রয়োজন নেই। তবে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য আরও বড়।
কারণ, ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে সরকার কার্যত একটি স্পষ্ট নীতি অবস্থান নিচ্ছে— সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরোনো মালিককে ফিরিয়ে এনে ব্যাংক পুনর্গঠনের চেয়ে নতুন মালিকানা, নতুন ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকির মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন করা হবে।
শুধু এস আলম নয়, বদলে যাচ্ছে পুরো মালিকানা কাঠামোর দর্শন
এ সিদ্ধান্তকে শুধু এস আলম গ্রুপকে ঘিরে দেখা হলে বিষয়টির ব্যাপ্তি কমে যায়। ১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে ভবিষ্যতে যেকোনও সংকটাপন্ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রশ্নের অবসান হবে। কোনও ব্যাংক যদি রেজুলেশনের আওতায় যায়, তখন ব্যাংকটির পুরোনো মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে সেই সিদ্ধান্তে আগের মালিকের স্বার্থের চেয়ে আমানতকারী, ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাবে। এটি ব্যাংক খাতের মালিকানা সংস্কারের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
এস আলমের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য কী
এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও অনুসন্ধান চলছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনে গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেন ও ঋণ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বলে সরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক খাত থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করার কার্যক্রম চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত এস আলমসহ বিতর্কিত মালিকানাগুলোর জন্য শুধু একটি ব্যাংকে ফেরার পথ বন্ধ করছে না; বরং ব্যাংক খাতের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে নীতিগতভাবেই কঠিন করে দিচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত, মামলা বা সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে গেল। সেগুলো আলাদা আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া। ১৮(ক) ধারা বাতিলের সরাসরি প্রভাব হলো— রেজুলেশনের আওতায় যাওয়া ব্যাংকের মালিকানা পুনরুদ্ধারের বিশেষ আইনি সুযোগ আর থাকছে না।
ব্যাংক খাত সংস্কারে এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট কেবল খেলাপি ঋণের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদের ওপর প্রভাব, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, একক বা গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতি। ফলে এখন ব্যাংক সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— শুধু দুর্বল ব্যাংককে বাঁচানো হবে, নাকি দুর্বল ব্যাংক তৈরির পেছনে থাকা ব্যবস্থাকেও পরিবর্তন করা হবে? ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত দ্বিতীয় পথের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
কারণ, ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখাই যদি একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে পুরোনো মালিককে ফিরিয়ে এনে মূলধন জোগাড় করাও একটি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ব্যাংক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, তাহলে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হবে।
আমানতকারীদের জন্য কী বার্তা
ব্যাংক খাতের যেকোনো সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমানতকারীর স্বার্থ। একটি ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে প্রথম প্রশ্ন হয়—গ্রাহকের টাকা নিরাপদ তো? বিশেষ করে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণের পর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হলো—ব্যাংক পুনর্গঠনের সময় পুরোনো মালিকের প্রত্যাবর্তনের চেয়ে আমানতকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিই অনুসরণ করা হবে।
তবে সামনে আরও বড় পরীক্ষা
১৮(ক) ধারা বাতিল করলেই ব্যাংক খাতের সব সমস্যা সমাধান হবে না। বরং এখন সরকারের সামনে আরও কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। একীভূত ব্যাংকগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করা, খেলাপি ঋণ আদায়, ভুয়া ও বেনামি ঋণের উৎস শনাক্ত করা, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, নতুন ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর তৈরি না হয়—এসবই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র শেয়ারধারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতির বোঝা কার ওপর পড়বে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একটি আইনি ধারা বাতিলের চেয়েও বড় বার্তা
সব মিলিয়ে ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি আইনি সংশোধন হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের পর রাষ্ট্র এখন যে বার্তা দিতে চাইছে, তা হলো—একবার কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় গেলে পুরোনো মালিকানা কাঠামোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পথ সহজ রাখা হবে না।
বিশেষ করে যেসব গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংক বড় ধরনের সংকটে পড়েছে, তাদের পুনরায় একই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ করাই এখন সরকারের নীতিগত অবস্থান। এস আলম গ্রুপের নাম ঘিরে যে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে তাই ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য হলো— ব্যাংক খাতে এস আলমের আগের মালিকানায় ফেরার যে সম্ভাবনা আইনগতভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই দরজা এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এটি ব্যাংক খাত সংস্কারের শেষ ধাপ নয়; বরং শুরু হতে যাওয়া আরও কঠিন সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম সিদ্ধান্ত। এখন দেখতে হবে, মালিকানা বদলের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, ঋণ অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।
কারণ, শুধু পুরোনো মালিককে সরিয়ে দিলেই ব্যাংক সুস্থ হয় না। ব্যাংককে সুস্থ করতে হলে টাকা উদ্ধার, দায় নির্ধারণ, শাস্তি, সুশাসন এবং আমানতকারীর আস্থা—এই পাঁচটি জায়গাতেই দৃশ্যমান ফল দেখাতে হবে।
১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে সরকার সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা সরিয়ে ফেলেছে। এখন আসল পরীক্ষা— এই সিদ্ধান্ত কতটা দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। এ ধারা সংযোজনের ফলে ব্যাংক খাতে নানা ধরনের জটিলতা ও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে ব্যাংক খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের যে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে, তা কাটিয়ে উঠতে শুধু এই ধারা বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করতে সরকারের আরও বেশ কিছু কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে আমানতকারী ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।









