ইউরোপের একাংশে ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলেও রবিবার অন্যান্য অংশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে রেকর্ড ভাঙা এই তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ১ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গরমে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই বয়োবৃদ্ধ। আবাসিক কেয়ার হোম এবং ব্যক্তিগত বাড়িগুলোতে হওয়া মৃত্যুর আরও তথ্য হাতে এলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গত ২০ জুন শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহটি ইউরোপের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আডানোম গেব্রেয়াসিস এক্স প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, এই মুহূর্তে ১৫ কোটি মানুষ চরম গরমের মধ্যে বাস করছেন, শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, স্কুলগুলো বন্ধ এবং বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো ভেঙে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে যা একসময় প্রজন্মের মধ্যে একবার ঘটা তাপপ্রবাহ মনে করা হতো, তা এখন প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে। আমাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
ইউরোপের বাড়িঘর, কর্মক্ষেত্র এবং স্কুলগুলো এই চরম গরমের উপযোগী নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই ধরনের তাপপ্রবাহ হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই রাতের বেলার তাপমাত্রা এত মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দুই দশক আগের তুলনায় এখন ১০০ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জার্মানি, পোল্যান্ড এবং ইতালিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের কিছু অংশে ঝড় শুরু হওয়ায় যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটেছে।
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার একটি প্রধান রেললাইনে ট্রেন চলাচল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাইপজিগে ট্রাম চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সূর্য না ডোবা পর্যন্ত অনেকেই ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছেন না। রোমে তীব্র গরমের মধ্যেও সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে রবিবারের প্রার্থনায় যোগ দেওয়ার জন্য ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন পোপ লিও।
এই চরম গরম ইউরোপের নদীগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলেছে। নদীর পানি কমে যাওয়া এবং উষ্ণ হয়ে ওঠার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। হাঙ্গেরি সরকার জানিয়েছে, শীতলকারক হিসেবে ব্যবহৃত দানিউব নদীর তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় রবিবার আবারও পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ইতালিতে পো নদীর পানি কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি দেশের ভেতরের দিকে ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবেশ করেছে, যা কৃষিকাজ এবং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের সংরক্ষিত জলাভূমির জন্য বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে ডুবে ডজনখানেক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইতালিতে উদ্ধারকারীরা দেশটির ক্যাবিনেট মন্ত্রী ইউজিনিয়া রোচেলার স্বামীর সন্ধান করছেন। রাজধানী রোম থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ভিকো হ্রদে সাঁতার কাটার সময় গত শনিবার থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানির কিছু অংশে বজ্রঝড় আঘাত হানতে পারে। এই সপ্তাহে পশ্চিম ইউরোপের বেশিরভাগ অংশে আবহাওয়া কিছুটা শীতল হতে পারে, কারণ তাপপ্রবাহটি এখন মধ্য ইউরোপ এবং বলকান অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দেশের বেশিরভাগ অংশে চরম গরম কমে এসেছে, তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি রয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার পরও এই তাপপ্রবাহের প্রভাব অন্তত ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিএফএম সম্প্রচারমাধ্যমকে তিনি বলেন, এই অধ্যায় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
গত শনিবার শেষের দিকে ফ্রান্সের কিছু অংশে বয়ে যাওয়া বজ্রঝড় কিছুটা শীতল হাওয়া নিয়ে এলেও এর ফলে হাজার হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনেডিস রবিবার বিকেলে এক হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ৩৬ হাজার পরিবার এখন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স

রাশিয়ায় ইউক্রেনীয় ড্রোনের তাণ্ডব, সুর পাল্টাচ্ছেন ট্রাম্প
৪০ ডিগ্রি ছাড়াবে তাপমাত্রা, এবার ‘হিট ডোমের’ সতর্কতা
তীব্র গরমেও কেন এসি ব্যবহার করতে পারছে না ইউরোপ
তীব্র গরমে বাড়ি ছেড়ে যেখানে ছুটছেন প্যারিসবাসী







