গোয়েন্দাদের হাতের প্রশ্নমালায় চারটে মোক্ষম প্রশ্ন। এক. নেতা-নেত্রীদের ফাঁদে ফেলার লাখ লাখ টাকা নগদে সরবরাহ করলেন কে বা কারা? দুই. ২০১৪ সালের করা স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফুটেজ দু’বছর পর, বিধানসভা ভোটের একেবারে মুখে বাজারে ছাড়া হলো কেন? তিন. ওই স্টিং অপারেশনের আগে-পরে কোন কোন রাজনৈতিক দলের কোন কোন নেতানেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল? চার. যে সাংবাদিক বরাবর জাতীয় স্তরে খবর বা স্টিং অপারেশন করেছেন, তিনি হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গকে বেছে নিতে গেলেন কার বা কাদের পরামর্শে?
নারদ নিউজের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার ম্যাথু স্যামুয়েলের জন্য এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে তৈরি কলকাতা পুলিশের তদন্তকারীরা। কিন্তু তাদের এড়াতে চাইছেন ওই সাংবাদিক। কলকাতা পুলিশ তাকে ই মেলের মাধ্যমে শমন পাঠিয়েছিল। সোমবার ম্যাথু ই মেল করেই জবাব দিয়ে জানিয়েছেন, বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন, অতএব ওই সমন কলকাতা পুলিশ যেন প্রত্যাহার করে নেয়। তবে আদালত কলকাতা পুলিশকে তদন্ত বন্ধ করতে এখনও নির্দেশ দেয়নি।
ম্যাথুর স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফুটেজে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলের কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতা-নেত্রীকে টাকার তোড়া নিতে দেখা গিয়েছিল। ম্যাথু একটি ভুয়ো সংস্থার নাম করে তার কর্তা সেজে তাদের কাছে গিয়ে জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে সংস্থাটি ব্যবসা করতে চায়। এবং সেজন্য সুবিধে পেতে মোটা টাকা উৎকোচ দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করা হবে না। ওই ভিডিও ফুটেজই মার্চ মাসে প্রকাশ করা হয়। ওই স্টিং অপারেশনের মাধ্যমেই আত্মপ্রকাশ করে নারদ নিউজ। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের প্রচার তখন তুঙ্গে। ঠিক সেই সময়ে নিজেদের একদল নেতা-নেত্রীকে টাকা নিতে দেখার ঘটনায় বেকায়দায় পড়ে তৃণমূল, হাতিয়ার পেয়ে যায় বিরোধীরা। যদিও নারদ-এর হুলে বিদ্ধ যারা বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হয়েছিলেন, তারা সবাই জিতে যান। বিপুল জয় পেয়ে দ্বিতীয়বার সরকার গড়ে তৃণমূল।
এবার সেই ম্যাথু স্যামুয়েলকে প্যাঁচে ফেলার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে কলকাতা পুলিশ। যাদের হাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারদের স্টিং অপারেশন নিয়ে ১৭ জুন তদন্তভার দিয়েছেন।
গোটা ঘটনার মধ্যে ষড়যন্ত্র থাকার দাবি একাধিকবার করেছেন মমতা। গোয়েন্দাদের একাংশের মতে, ষড়যন্ত্র মানেই যে সেটা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলের থেকে হয়েছে, এমনটা নাও হতে পারে। তৃণমূলের একাধিক নেতা এতে সামিল বলে গোড়া থেকে দলেরই একটা অংশ দাবি করে আসছে। দিল্লিতে নিয়মিত আনাগোনা আছে, এমন দু-তিন জন সংসদ সদস্যের নামও উঠে আসে। গোয়েন্দাদের প্রশ্ন, দলের কার বা কাদের মাধ্যমে স্যামুয়েল তৃণমূলের ওই নেতা-নেত্রীদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন? তদন্তকারীদের একাংশের মতে, এমন এক বা একাধিক নেতার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন যে, তারা বলে দেওয়ায় সহজেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে ফেলেন ছদ্মবেশী ওই সাংবাদিক। তা হলে তারা কারা?
এক গোয়েন্দা অফিসার বলেন, ‘প্রায় প্রতিটি ভিডিও ফুটেজে তৃণমূলের ওই নেতা-নেত্রীরা টাকা নেওয়ার সময়ে বাংলায় কথা বলছেন। তা হলে ম্যাথু স্যামুয়েলের সঙ্গে এমন কেউ সেই সময়ে ছিলেন, যিনি বাঙালি। কে সেই ব্যক্তি?’
আবার গোয়েন্দারা জেনেছেন, নারদের ভিডিও ফুটেজে এমন এক জনকে অক্লেশে টাকা নিতে দেখা গিয়েছে, যিনি দীর্ঘকালের ঝানু রাজনীতিবিদ, নিজের হাতে কখনও টাকা নেন না। তিনিই বা নিতে গেলেন কেন? তদন্তকারীদের কারও কারও মতে, এমন কারও ‘রেফারেন্স’ দেওয়া হয়েছিল, যাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না।
তৃণমূলের এক সংসদ সদস্য ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছেন, ‘ওর পকেটে মোবাইলটা যেভাবে রাখা ছিল, সেটা দেখে আমার সুবিধের বলে মনে হয়নি। আমি তখনই একটা গোলমালের গন্ধ পেয়েছিলাম। তাই আমার টাকা নেওয়ার ছবি কিন্তু নেই।’
লালবাজারের এক অফিসার বলছেন, ‘যেসব প্রশ্ন আমরা ম্যাথুকে করব, তার কয়েকটির উত্তর আমরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছি। আমাদের হাতে কিছু অকাট্য প্রমাণও আছে। এখন দেখার, ম্যাথু স্যামুয়েল নিজে কী বলেন।’
/এপিএইচ/আপ-এনএস/
আরও পড়ুন: মিতু হত্যাকাণ্ড: ভোলা ‘খুনিদের’ অস্ত্র দেয়, সরবরাহ করে মনির








