ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সেনা ঘাঁটিতে হামলাটি বেশ পরিকল্পনা করেই করা হয়। জওয়ানদের হতচকিত করতে আগের সেনাদের স্থলে নতুন সেনারা ঘাঁটির দায়িত্ব নেওয়ার সময়টাকেই বেছে নেওয়া হয়। আর হামলার সময় সত্যিকার অর্থেই বিহ্বল হয়ে পড়েন ঘাঁটিতে আসা নতুন সেনারা। হামলার ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে এ সব তথ্য জানিয়েছেন ভারতের বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, উরি সেনাঘাঁটির অভ্যন্তরের বিভিন্ন তথ্য আগে থেকেই জানত হামলাকারীরা। তারা জানত, উত্তর কাশ্মিরের সীমান্তের কাছে ওই ঘাঁটিতে দায়িত্ব হাতবদল হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ১০ ডোগরা রেজিমেন্টকে সরিয়ে ঘাঁটির দায়িত্ব নিচ্ছেন ৬ বিহার রেজিমেন্টের জওয়ানরা।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, হামলাকারীরা জানত, এই দায়িত্ব বদলের সময়ে হামলা চালালেই সব চেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটানো সম্ভব। ঘাঁটির মধ্যে নতুন জওয়ানরা কোথায় আস্তানা গেড়েছেন, কোথায় ডিজেল মজুত করা হয়েছে, তা আগে থেকে চিহ্নিত করেই হামলার পরিকল্পনা হয়।
সেনা সূত্র জানায়, রবিবার ভোরে উরির যে সেনাঘাঁটিতে হামলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) থেকে তার দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। এই ঘাঁটিটি সেনাবাহিনীর দ্বাদশ ব্রিগেডের অধীন। সেনাদের যে শিবিরে হামলা হয়েছে, সেটি ব্রিগেড সদর দফতরের ঠিক পেছনেই। উরির এই ঘাঁটিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এর ভৌগোলিক অবস্থান। ওই এলাকার চেহারা অনেকটা গামলার মতো। যে গামলার একেবারে নিচের অংশে রয়েছে উরির সেনাঘাঁটি। নিয়ন্ত্রণরেখার উল্টো দিকে পাকিস্তানের এলাকা হলো উঁচুতে। যেখান থেকে চাইলে উরির সেনাঘাঁটিতে নজরদারি চালানো সম্ভব।
ভারতের সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, এই ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই উরির হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানি সেনা ও আইএসআই-এর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, নিয়ন্ত্রণরেখার ওপার থেকে যথেষ্ট সময় নিয়েই পাকিস্তানি সেনা ও আইএসআই নজরদারি চালিয়েছে। উরির ঘাঁটিতে যে বাহিনী বদল হচ্ছে, তা দেখেই জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গিদের পাঠানো হয়। নিয়ন্ত্রণরেখার ওপার থেকে পাক সেনা ও আইএসআই অফিসাররাই তাদের নিয়ন্ত্রণ করছিল।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার রাতেই ৬ বিহার রেজিমেন্টের অ্যাডভান্স পার্টির ৬০ থেকে ৮০ জন জওয়ান সেনাঘাঁটিতে আসেন। মূলত তাঁবু ও অস্থায়ী শিবিরে ওই জওয়ানদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ওই ঘাঁটিতে এই জওয়ানরা নতুন। তাই আচমকা হামলায় যে তারা হকচকিয়ে যাবেন তা বুঝতে পেরেছিল হামলাকারীরা। রবিবার ভোরে সেনা জওয়ানরা যখন ক্লান্ত শরীরে ঘুমোচ্ছেন, সে সময়ই হামলা চালানো হয়। তাঁবুর উপরে বোমা ও গ্রেনেড ফেলা হয়। তার আগে তাঁবুর কাছেই মজুত করে রাখা ডিজেলে আন্ডার ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চার থেকে গ্রেনেড ছোড়া হয়। ডিজেলের জন্য দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসার সময়ই জওয়ানদের ওপর একে-৪৭ থেকে গুলি বৃষ্টি শুরু হয়। অনেকে আহত হয়ে পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে আগুন ধরে যায়। ১৭ জন নিহত জওয়ানের মধ্যে ১৩-১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে। আহতদের অনেকেও যথেষ্ট দগ্ধ হয়েছেন।
সেনা কর্মকর্তাদের মতে, নিহত চার হামলাকারীই কমান্ডো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নিহত হামলাকারীদের কাছ থেকে উরি ঘাঁটির মানচিত্র উদ্ধার রয়েছে। যেখানে পাখতুন ভাষায় বিভিন্ন জায়গা চিহ্নিত করা রয়েছে। অনুপ্রবেশের জন্য ওই এলাকার একটি নালাকে জঙ্গিরা কাজে লাগিয়েছিল বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।
কর্মকর্তারা জানান, উরির ভৌগোলিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় মহুরা ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল। সেই হামলাতেও নিরাপত্তা বাহিনীর ১০ জওয়ান নিহত হন।
উল্লেখ্য, ১৮ সেপ্টেম্বর (রবিবার) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ভারি অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক কাশ্মিরের উরিতে লাইন অব কন্ট্রোলের নিকটে সামরিক বাহিনীর একটি প্রশাসনিক স্থাপনায় হামলায় চালায়। ওই হামলায় ১৭ সেনা সদস্য ও ৪ হামলাকারী নিহত হন। এখন পর্যন্ত কোনও সংগঠনের পক্ষ থেকে ওই হামলার দায় স্বীকার করা হয়নি। তবে হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদকেই সন্দেহ করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে চলতি বছরের প্রথমদিকে পাঞ্জাবের পাঠানপকোটে ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলার জন্যও ওই সশস্ত্র সংগঠনটিকে দায়ী করেছিল ভারত। জঙ্গি এ সংগঠন পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং পাকিস্তানে থেকেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে বলে ভারত দাবি করে আসছে। সূত্র: আনন্দবাজার।
/এএ/








