লোকসভা নির্বাচন: কাশ্মির হামলা এগিয়ে দেবে মোদিকে

আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:২১আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:০৪
image

ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের দিন-তারিখ এখনও নির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করেনি দেশটির নির্বাচন কমিশন। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ও আংশিকভাবে হলেও বিভিন্ন প্রদেশে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনি প্রচারণা। আসাম, পশ্চিম বাংলা, গ্রেটার দিল্লি ছাড়াও কর্নাটকে দেখা গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর মিছিল-সভা। বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, শিবসেনা ও ডিএমকে পার্টির সমর্থন নিয়ে বিজেপি এখনও কংগ্রেস, তৃনমূল কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির মতো দলের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছে। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনি জরিপগুলোতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমতে দেখা গেলেও, সার্বিকভাবে তাদের এগিয়ে থাকার চিত্রই ফুটে উঠেছে। কাশ্মিরের পুলওয়ামা হামলার পর ভারতীয় ভোটারদের মনে জাতীয়তাবাদী আবেগ তীব্র হয়ে উঠতে বাধ্য, যা নির্বাচনি লড়াইয়ের ময়দানে বিজেপিকেই সহায়তা করবে। লোকসভা নির্বাচন: কাশ্মির হামলা এগিয়ে দেবে মোদিকে

ভারতের অন্যান্য অংশ এখনও তুলনামূলকভাবে শান্ত। বিজেপি ও কংগ্রেস নিজ নিজ দলের পক্ষে ছোট ছোট আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চলছে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতার উদ্যোগ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, আঞ্চলিক দলগুলোর মনোভাব। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আম আদমি পার্টির কেজরিওয়াল পর্যন্ত মনে করেন, এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা বিজেপি নয়, সরকার গঠনে মূল নিয়ামক হয়ে উঠবে আঞ্চলিক দলগুলো। ২০১৪ সালে বিজেপি যেভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, এবার তা হবে না।

প্রচারণার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি কংগ্রেসের তুলনায় খুব একটা বেশি নির্বাচনি মিছিল-সভা আয়োজন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীর পদ সামলাতে ব্যস্ত মোদি কিছুটা চাপে আছেন। সেই সুযোগে কংগ্রেস তাদের সভাপতি রাহুল গান্ধীর জন্য যত বেশি সম্ভব কর্মসূচির আয়োজন করে চলেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে সামনে নিয়ে এসে কংগ্রেস জানান দিয়েছে, তারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা চালাতে চায়। প্রিয়াঙ্কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করে, এতে নারী ও নতুন ভোটারদের মন জয় করা সহজ হবে। আর এতে বিজেপির সুবিধা হয়েছে কংগ্রেসকে রাজনীতির নামে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগে অভিযুক্ত করার।

অস্বীকার করার উপায় নেই বিজেপির আগামী নির্বাচনে ২০১৪ সালের মতো সফলতা কোনওভাবেই পাবে না। গত পাঁচ বছরে বিজেপির শাসনে সফলতা-ব্যর্থতা দুটোই রয়েছে। অর্থনীতি প্রথমে কিছুটা স্থবির ছিল। কিন্তু পরে অবস্থা ভালো হতে শুরু করে। প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশ থেকে ৭.২ শতাংশে উন্নীত হয়। কিন্তু ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করে দেওয়া ও জিএসটি (গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স) আইন পরিবর্তনের পর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সালে নির্বাচন যখন আসন্ন, তখন এসব প্রক্রিয়ার কিছু সুফল আসতে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু বিজেপির শাসনামলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে উন্নতি হয়েছে খুবই সামান্য। এদিকে জ্বালানি আমদানিতে যে ব্যয় হচ্ছে তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে কম। প্রশাসনিক দিক থেকে সমস্যা দেখা দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সিবিআইকে নিয়ে।

২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজেপির নির্বাচনি ফলাফলও খারাপ হতে থাকে। দলটি টানা দশটি লোকসভা উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। ২০১৮ সালে দলটি মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ের মতো ভালো অবস্থান থাকা প্রদেশগুলোর নির্বাচনে হেরে যায় বিজেপি। কর্নাটকে খুব অল্প ব্যবধানে হলেও দলটিকে হার মানতে হয়।

অন্যদিকে বিজেপির শাসনামলে অর্জনের মধ্যে রয়েছে ভারতকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করার সাফল্য। এর আকার যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির আকারের চাইতেও বড় হয়ে উঠেছে প্রথমবারের মতো। অর্থনৈতিক উন্নতির এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার সুযোগ পেতে পারে। দুর্নীতি দমনে বিজেপি সরকার নতুন আইন পাস করেছে। অস্ত্রপাচার থেকে শুরু করে অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
এমন কি সাবেক মন্ত্রী পি চিদাম্বরম, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী, এমন কি কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা করা হয়েছে। তারা সবাই এখন জামিনে রয়েছেন। কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে শিল্পপতি বিজয় মালিয়্যাকে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও বিজেপি সরকার যথেষ্ট অগ্রগতি করেছে। নিরব মোদি ও মেহুল চোকসি নামের দুই ঋণ খেলাপিকে আটক করা সম্ভব না হলেও তাদের প্রায় ১২ হাজার কোটি রুপির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ২০ হাজার কোটি রুপি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিজেপি সরকারের এই শাসনামলে কর আইনে যেমন সংস্কার আনা হয়েছে, তেমনি বেড়েছে কর আদায়ের পরিমাণ। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ২৬ হাজার ৫০০ কোটি রুপির খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়েছে। গত তিন বছরে ঋণ খেলাপির দায়ে অভিযুক্ত করার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।

ভারতজুড়ে প্রায় এক কোটি শৌচাগার নির্মাণ করেছে বিজেপি সরকার। এতে খরচ হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি রুপি। দরিদ্রদেরও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং খাতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে। শতভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিজেপি সরকার তিন তালাককে অবৈধ ঘোষণা করতে আইনও পাস করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ধরে নেওয়া যায়, এটি রক্ষণশীল মুসলিম নারী ভোটারদেরও সন্তুষ্ট করেছে।

এই শাসনামলে বিজেপি সবচেয়ে বড় যে ধাক্কাটা খেয়েছে সেটা হলো কাশ্মিরের পুলওয়ামা হামলা। যদিও ওই আত্মঘাতী হামলাটি আসলে কাশ্মিরে সরকারের দীর্ঘদিন যাবৎ চর্চা করা ভুল নীতির চূড়ান্ত পরিণতি। ২০১৬-২০১৭ সালে সন্দেহভাজন পাকিস্তানিদের অনুপ্রবেশের সংখ্যা ৩৭১ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০৬ জনে উন্নীত হয়েছে। একই সময়কালে সশস্ত্র সংঘাতে মৃতের সংখ্যা ২৬৭ জন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫৮ জনে উন্নীত হয়েছে।

সামাজিক কল্যাণ খাতে বিজেপির সফলতা এতটাই বেশি যে রাহুল গান্ধী বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির সমালোচনার জন্য শেষ পর্যন্ত কাশ্মির ইস্যুকেই বেছে নিয়েছেন। দুর্নীতির বিষয়ে দল দুইটি নিজেরাই প্রশ্নের মুখে রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের কারণে মমতার পক্ষে দিনকে দিন নিজের সরকারের ‘দক্ষ ও সৎ’ ভাবমূর্তি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ মন্তব্য করেছেন, ‘সারদা চিট ফান্ড ও নারদা ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার দায়ে তৃনমূল কংগ্রেসের নেতাদের জেলে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি থেকে শুরু করে সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামপন্থীদের জোট পর্যন্ত সবাই অভিযোগ করছে, মমতা সব রাজনৈতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে সরকারি ক্ষমতা ও পেশিশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধীদের দমনের চেষ্টা করছেন। আর তাই তৃণমূলের নেতৃত্বে বিজেপি বা বাম জোটের কেউই কোনও নির্বাচনি সমঝোতায় যেতে ইচ্ছুক নয়।

কিন্তু তারপরও বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলওয়ামা হামলার প্রেক্ষিতে ভারতের ভোটারদের মধ্যে এখন জাতীয়তাবাদী আবেগ কাজ করছে অনেক বেশি। পাকিস্তান সমর্থিত সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেই এখন ভারতের মানুষ একজোট। ‘তথাকথিত’ উদারপন্থীরা রক্ষণাত্মক ভূমিকা নিয়েছেন। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের সোচ্চার করে তোলার চেষ্টা করেও সফল হননি। পুলওয়ামা হামলার কারণে আগামী নির্বাচনে ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ নির্বাচনি লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবে মোদিকে।

/এএমএ/
সম্পর্কিত
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম