কাশ্মিরের পুলওয়ামা হামলার প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা পাকিস্তানকে বেশি অখুশি করেছে না কি তৃনমূল কংগ্রেস, পিডিপি ও হুররিয়াত কনফারেন্সের মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে, তা বলা মুশকিল! মোদির জবাবের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের মোদিবিরোধী ভূমিকা তীব্রতা হারিয়েছে। তৃনমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিমান হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অন্যদের সরকারের নিন্দায় রাজি করাতে পারেননি। বিজেপির ভেতরেও যারা মোদির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন, তারা আবার সহায়ক ভূমিকায় ফিরে গেছেন। মোদির তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত আসাদুদ্দিন ওয়েসির মতো রাজনীতিবিদও ভারতের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত মাসুদ আজহারকে ‘মওলানা নয়, শয়তান’ আখ্যা দিয়েছেন।
২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলার শিকার হয় দেশটির সিআরপিএফের অন্তত ৪০ সদস্য। ভারত ওই হামলার জন্য দায়ি করে পাকিস্তানকে। সেনাবাহিনীকে যেকোনও ব্যবস্থা গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত দাবি করে, তারা পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা করে জঙ্গি ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করেছে। এতে মারা গেছে শত শত জঙ্গি। ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বিমানের হামলায় বিধ্বস্ত হয় ভারতীয় একটি বিমান। ধৃত বৈমানিককে বিনা শর্তে ফেরত দেওয়ার দাবি জানায় ভারত। পাকিস্তান শুক্রবার ফেরত দেয় সেই বৈমানিককে। মোদি যেমন পাকিস্তানে ঢুকে হামলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করান, তেমনি ধৃত বৈমানিককে ফিরিয়ে আনতেও সমর্থ হন।
পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালালেও কোনও দেশই প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ায়নি; সৌদি আরব বা চীন কেউই নয়। বরং ৪৯টি দেশ কাশ্মির অঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ, রাশিয়া, চীন এবং অস্ট্রেলিয়া শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানকে জঙ্গি তৎপরতা দমনে আরও কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করতে বলেছে।
এদের কেউ কেউ পুলওয়ামা হামলার দায় স্বীকার করা সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছে। পুলওয়ামা হামলার প্রেক্ষিতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সম্মান হারিয়েছে। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলে বক্তব্য দেওয়া সংশ্লিষ্ট বক্তারাও বলেছেন, জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো ‘সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের’ ‘আশ্রয় দেওয়ার’ জন্য পাকিস্তানকে অনেক চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে।
পুলওয়ামা হামলার পরে নেওয়া ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অবস্থান আবার সংহত হয়েছে। এ ঘটনার আগে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রচণ্ড সমালোচনার শিকার হচ্ছিলেন। দেশের নানান অভ্যন্তরীণ বিষয় ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিম্নহার, দুর্নীতি দমনে আশাব্যঞ্জক সাফল্য আসা না আসা নিয়ে বিরোধীদের তোপের মুখে ছিলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আসলে এক ঢিলে অনেক পাখি মেরেছেন।
তৃনমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে মন্তব্য করেন, ‘তিনি বিরোধী দলমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ’ দেখতে চান, সেখানে বিরোধী দলের নেতারা এখন অভিযোগ তুলছেন, বিমান বাহিনীর পাকিস্তান অভিযানের মতো বিষয়ে আলোচনার জন্য মোদি কেন তাদেরকে ডাকেননি! মোদি সশস্ত্র বাহিনীর রাজনীতিকরণ করছেন।
পুলওয়ামা হামলার পরে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে মোদি আবার তার নামে মুহুর্মুহু স্লোগান শুনতে পারছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারির পরেও তিনি তার পূর্বনির্ধারিত প্রায় সব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। যেন এমন কিছুই হয়নি যা সরকারের হাতের বাইরে। লোকসভা নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনতে একের পর এক সমাবেশে যোগ দিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অপ্রত্যাশিত কিন্তু বিকট উসকানি মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যতে একে দিয়েছিল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তার সামনে দেখা দিয়েছিল পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ। তৃনমূল কংগ্রেসের মতো দলগুলোর জন্য মোদির এই অস্বস্তিকর অবস্থান কৌতুককর হয়ে উঠেছিল। পুলওয়ামা হামলার পর পাকিস্তান যেখানে সম্পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে সেখানে একটি যথার্থ জবাব দেওয়ার পরিকল্পনা কঠিন ছিল। এমন কিছু একটা করতে হতো, যা পর্যাপ্ত হবে, কিন্তু বেপরোয়া হবে না।
ভারতের বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নেতাও গোপনে স্বীকার করেছেন, টিম মোদি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। বিমান হামলা এবং আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা বিজেপিকে নতুন করে শক্তি যুগিয়েছে, বিরোধীদের শক্তি হ্রাস করিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, দলের ভেতরেও নীতিন গায়কোয়াড়ে, অরুণ জেটলি এবং রাজনাথ সিংয়ের মতো যারা মোদির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে চাচ্ছিলেন, তারাও পিছিয়ে গেছেন, গ্রহণ করেছেন পূর্বের সহযোগিতামূলক ভূমিকা। কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, এআইএমআইএমের আসাদুদ্দিন ওয়েসি এবং কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আব্দুল্লাহ মোদি সরকারের বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিয়েছেন। মোদির ভূমিকার কারণে তারা এ কয়দিন প্রকাশ্যে মোদির সমালোচনা থেকে বিরত রয়েছেন।
বিরোধীদের মধ্যে একজনের অবস্থানই শুধু ভিন্ন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা ভারতীয় বিমান হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২১ দলের যৌথ সভাতে মমতা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে করা অবস্থান নিয়েছিলেন। সরকারের সমালোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েও তিনি অন্যান্য দলের নেতাদের রাজি করাতে পারেননি।
২০১৪ সালে যেমন মোদি বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলেন, লোকসভা নির্বাচনের মুখে এবারও তেমনটাই হয়েছে। বিরোধীরা যেকোনও মূল্যে মোদির পতনের যে ডাক দিয়েছিলেন তা বহুলাংশেই স্তিমিত হয়ে গেছে। ভারতের ভোটারদের মধ্যে এখন জাতীয়তাবাদী আবেগ কাজ করছে।
আগামী লোকসভা নির্বাচনে বড় জয়ের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিজেপির নেতারা । কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, রাজ্যে বিজেপি আগামী নির্বাচনে ২০টি আসনে জিতে আসবে। বিজেপির সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নেতাদের বিশ্বাস, বিজেপির পক্ষে লোকসভা নির্বাচনে আবারও তিনশর কাছাকাছি আসনে জয় পাওয়া সম্ভব হবে।








