আসামের এনআরসি যেভাবে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে

আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫১আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫২

রায় ঘোষণা বা নির্দেশনা জারির পর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারকের সমালোচনার মুখে পড়ার  ঘটনা বিরল। এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। অবসরের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা বা এনআরসি কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্তের কারণে সহকর্মীর সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

আসামের এনআরসি যেভাবে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে

ভারতীয় রাজনীতিকরা যখন আসামের এনআরসি হালনাগাদ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন তখন তারা মনে করেছিলেন এতে করে রাজ্যটিতে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা জানা যাবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জানিয়েছে তাদের কোনও নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন না। ফলে প্রমাণ করা না গেলে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত কোনও ব্যক্তিকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না।

তিন বছর ধরে বেশ ঢাক-ঢোল পিঠিয়ে এনআরসি’র কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু আসামের অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা অজানাই রয়েছে গেছে। এছাড়া আসামের এই উদ্যোগের কারণে বহির্বিশ্বে ভারতের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে এনআরসি নিয়ে যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তা অন্য কোনও ক্ষেত্রে ঘটেনি। এমনকি ভারতেও এনআরসি অবদমন ও বিভক্ত বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করেছে ২৮ টির মধ্যে ১৫টি রাজ্যে। মজার বিষয় হলো, শুরুতে এনআরসি নিয়ে বিজেপির কোনও ভূমিকাই ছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই এনআরসি শুরু হয়। প্রধান বিচারপতি হিসেবে পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন রঞ্জন গগৈ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জটিল একটি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন তিনি। এক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কর্মকর্তাদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সাবেক প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনা থাকলেও লাখো দরিদ্র মানুষ তাদের ন্যূনতম অধিকার হয়রানি থেকে ঠেকাতে পারেনি।

সম্প্রতি বিচারক ও দিল্লিভিত্তিক বুদ্ধিজীবীদের দুটি আলোচনায় দিল্লি হাই কোর্টের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ.পি. সমালোচনা করেছেন সাবেক ভারতীয় প্রধান বিচারপতির। তিনি দাবি করেছেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অগ্রাধিকার ও জনগণের অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট এখন ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হওয়ার বদলে অনেক বেশি নির্বাহী কমিটি হিসেবে কাজ করছে।

আসামের এনআরসি প্রকল্প নিয়ে রঞ্জন গগৈরের কথা উল্লেখ করে বিচারপতি শাহ বলেছেন, যখন সাবেক বিচারপতি জানতে পারলেন আসামের বন্দি শিবিরে মাত্র ৯০০ জনকে আটক করা হয়েছে তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞেস বলেছিলেন, ‘মাত্র ৯০০?’। তিনি আরও বলেন, বিচারপতির যখন এই অবস্থা তখন দরিদ্রদের ন্যূনতম অধিকার রক্ষার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।

মুখবন্ধ খামে এনআরসি’র অগ্রগতি আদালতকে জানাতে সাবেক প্রধান বিচারপতির নির্দেশেরও সমালোচনা করেন দিল্লি হাই কোর্টের সাবেক বিচারপতি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় একটি উদ্যোগ নিয়ে কেন গোপনীয়তা। কেন জনগণকে জানানো হলো না কীভাবে তাদের মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এনআরসি যতই চূড়ান্ত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি এই উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছিল। তারা দাবি করছিল, এনআরসি কংগ্রেসের পরিকল্পনা এবং সুপ্রিম কোর্টই বাস্তবায়ন করছে। এর সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে তারা সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।

তবে দলটির এই দাবি পুরোপুরি সত্যি না। বিজেপি নেতারা কেবল নির্বাচিত তথ্য তুলে ধরেছেন। এনআরসি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে যে সমালোচনা শুরু হয়েছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতের পাশে নেই। বিদেশের সমালোচনায় বিজেপি আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার কেড়ে নিতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক চারুব্রত রায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির সাবেক সভাপতি অমিত শাহ যে বারবার অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন ও কারাগারে রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন তা ভুলে যাওয়া কঠিন। কিন্তু তারা আসামসহ বিভিন্ন স্থানে এনআরসিকে হাতিয়ার করে পূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করেছে। মুসলিমদের প্রান্তিক করার কট্টরনীতির অংশ হিসেবেই তারা এমনটি করেছে।

এনআরসি’র রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পুরো ভারতে মুসলিমদের অভূতপূর্ব ঐক্যের জন্ম দিয়েছে এবং ১৫টি রাজ্যে গুরুতর রাজনৈতিক প্রভাব রেখেছে। সর্বশেষ দিল্লির নির্বাচনে ডানপন্থী বিজেপির আরকেটি ভরাডুবি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ভাবতে শুরু করেছেন যে, পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়াও শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত পুরো ভারতে এনআরসি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেই।

এনআরসির সমর্থক ও আসামে বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এস. সানোয়াল দশটি বন্দি শিবির গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এনআরসি নিয়ে সৃষ্ট বিপর্যয়ের মুখে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার অমুসলিম বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। 

/এএ/
সম্পর্কিত
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হলেন ঋতব্রত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম