দুই দশক ধরে কয়লাকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ার পর গৌতম আদানি এবার জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়িয়ে নিজের শিল্প গ্রুপের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে উৎসাহ পাচ্ছে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা।
খনি, বন্দর এবং পাওয়ার প্লান্ট থেকে শুরু করে বিমানবন্দর, ডাটা সেন্টার এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বিস্তৃত করে ভারতের অবকাঠামো বাদশাহ হিসেবে উঠে এসেছেন আদানি। দেশটির অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে এসব খাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন নরেন্দ্র মোদি। আর সরকারের লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন এসব খাতের বিনিয়োগকারীরা।
গত বছর মহামারির মধ্যে আদানি গ্রুপের তালিকাভুক্ত ছয়টি ইউনিটের বাজারমূল্য বেড়েছে সাত হাজার নয়শ’ কোটি ডলার। ভারতের দুই শীর্ষ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য টাটা গ্রুপ এবং মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বাধীন রিলায়েন্স গ্রুপের পর এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা। আদানির কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে ফ্রান্সের তেল কোম্পানি টোটাল এসই এবং ওয়ারবার্গ পিনাকস এলএলসি।
দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সাতটি বিমানবন্দর এবং ভারতের বিমান চলাচলের এক-চতুর্থাংশের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন আদানি। ২০২৫ সালের মধ্যে নিজেদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা আট গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন তিনি। ভারতের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি ঋণ সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চান এই ধনকুবের। গত সপ্তাহে তিনি শ্রীলঙ্কায় একটি বন্দর টার্মিনাল উন্নয়নের কাজ পেয়েছেন তিনি। চীনা প্রভাব মোকাবিলায় এই প্রতিবেশী দেশটিকে কাছে টানতে চাইছেন মোদি। এছাড়া গত মাসে ভারতজুড়ে ডাটা সেন্টার তৈরি ও পরিচালনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে আদানি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড।
ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকোনোমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের পরিচালক টিম বাকলে বলেন, আদানি রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ আর তিনি বেশিরভাগই বিচক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন। এসব প্রকল্প মূলত সরকারি অগ্রাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ফলে যতক্ষণ ভারতের টেকসই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ আদানির নেতৃত্বে গ্রুপটি সমৃদ্ধ হতে থাকবে।
গত সেপ্টেম্বরে জেপি মরগান ইন্ডিয়া সামিটে আদানি বলেছিলেন, দেশ গঠনের দর্শন ধারণ করে ভারতের অবকাঠামো গড়ে উঠেছে আর গ্রুপটি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের অভূতপূর্ব দাম সরবরাহ করেছে।
১৯৮০’র দশকের শেষ দিকে নিত্যপণ্য দিয়ে ব্যবসায় আসেন আদানি। কিন্তু এখন তিনি জ্যাক মা’র চেয়েও বেশি ধনী এবং ভারতের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনকুবের। তার মোট সম্পদের পরিমাণ পাঁচ হাজার ছয়শ’ কোটি ডলার। গত এক বছরেই তিনি অর্জন করেছেন পাঁচ হাজার কোটি ডলার। যা এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির থেকেও পাঁচশ’ কোটি ডলার বেশি। এই বছর আদানির সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ অন্য যে কোনও ধনকুবের থেকেই বেশি।
২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি কয়লা প্রকল্পের কাজ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন আদানি। এর মধ্যেই তিনি জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। পরিবেশবাদীরা ‘আদানিকে থামাও’ প্রচারণা চালালে বিঘ্নিত হয় তার উন্নয়ন পরিকল্পনা। ২০১৯ সালে ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং স্থানীয়দের চাকরি তৈরি করা।
তবে নিজ দেশে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর আদানিকে নিয়ে শুরু হয় আরেক বিতর্ক। বিরোধিরা বলে থাকেন, আদানির সাফল্যের মূল কারণ মূলত মোদির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, মোদির নীতির সঙ্গে তার বিনিয়োগ ও সমৃদ্ধির সামঞ্জস্য রয়েছে।
সমালোচকরা বলে থাকেন, মোদি সরকার বিমানবন্দরে দরকষাকষির নিয়ম বদল করায় সুবিধা পেয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার পরও আদানির গ্রুপ তা পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সূত্র: ব্লুমবার্গ









